আপনি দেখছেন
সর্বশেষ আপডেট: 27 মিনিট আগে

জওহর লাল নেহ্‌রু বলেছিলেন, 'একটি দেশ ভালো হয় যদি তার বিশ্ববিদ্যালয় ভালো হয়।' একটি দেশে কতটুকু গণতান্ত্রিক পরিবেশ আছে তা জানতে হলে ওই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকাতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের চর্চা হয় প্রতিষ্ঠানে। সেটা হতে পারে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে গণতন্ত্র ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে বইয়ের পৃষ্ঠায়। যেসব শিক্ষকরা ক্লাশে গণতন্ত্র পড়ান তারা আজ চুপ করে আছেন। ভয়ে কিংবা পদের লোভে তারা মাথা লুকিয়েছেন উটপাখির মতো।

quota reform movement april 18

কোটাকে যৌক্তিক সংস্কারের আন্দোলনে গণমানুষের দাবি রয়েছে কিনা, সেটা না খুঁজে সরকার খুঁজলো এই আন্দোলনে জামায়াত-বিএনপির সমর্থন আছে কিনা! যদি কোনো সরকার নিজেকে গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে স্বীকার করে তাহলে তাকে গণমানুষের কথা শুনতে হবে। না শুনলে ফ্যাসিজমের সঙ্গে গণমানুষের কথা না শোনা গণতন্ত্রের কোনো পার্থক্য নেই।

আমরা লক্ষ্য করলাম, লক্ষ-কোটি শিক্ষার্থীকে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে কিংবা দলের কাছে নিজেকে অতি আস্থাবান হিসেবে উপস্থান করার বাসনা থেকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বা ‘জঙ্গিদের মতো’ বলে আখ্যা দিলেন অনেকে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঢালাওভাবে এমন স্পর্শকাতর দুটি শব্দ দ্বারা আখ্যা দিতে গিয়ে এ বিষয়টিকে ‘হালকা’ করে দেয়া হয়েছে। এই ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্যের নিন্দা জানানোর ও দুঃখ প্রকাশ করার ভাষা জানা নেই।

ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে পড়েছি ছাত্রলীগের গৌরব, সংগ্রাম ও সোনালী দিনগুলোর কথা। যে ছাত্রলীগের শহীদ ভাইদের বুকের রক্ত নদী পেরিয়ে আজকের এই বাংলাদেশ, সে ছাত্রলীগ আজ কোন পথে? এতটা নিচতা, এতটা শঠতা, এতটা গণবিরোধী অবস্থান ছাত্রলীগের প্রকৃত কোনো নেতাকর্মী নিতে পারে বলে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।

উপাচার্যের বাসায় কেন তাণ্ডব চালানো হলো?- এই প্রশ্ন ওঠার পর শিক্ষার্থীরা ওই হামলায় অভিযুক্তদের বিচার দাবি করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ওপর কারা হমলা করলো, আশিকুরের বুকে কে গুলি চালালো, তরিকুলের হাড় কে ভেঙে দিল তার বিচার কি সবাই চাইবেন? শিক্ষকের দিকে এক আঙ্গুল তুলে কথা বলা সেই ছাত্র কি ভেবে দেখেছে বাকি ‘তিন আঙ্গুল’ তার ‘নিজের বিবেকের’ দিকে তাকিয়ে ছিল?

quota reform movement 2018 april

আরেকটা কথা বলি, চেতনাকে পাকিস্তানিরা ব্যবহার করতো ব্যক্তি স্বার্থে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর যখনই কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন হতো, তখনই সেই আন্দোলনকে ‘ইসলামী’ চেতনা ব্যবহার করে দমন করা হতো। কারণ এদেশের মানুষ জীবন দিয়ে ধর্ম লালন করে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের কাছে অপ্রিয় করার জন্য পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে ‘হিন্দুস্থানের দালাল’ ট্যাগ দিয়েছিল। সেই ট্যাগ মিথ্যা প্রমাণ করে লক্ষ-কোটি মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।

তাই মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। এই চেতনাকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে এতো বিপুল সংখ্যক সাধারণ শিক্ষার্থীর দাবিকে ঢালাওভাবে ‘জামায়াত-বিএনপির আন্দোলন’ ট্যাগ দেয়াটা খুবই দুঃখজনক। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে খাটো করা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। কারণ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পক্ষে কেউ বলেনি। শুধু দাবি ছিল এটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনা হোক। কিন্তু এই দাবিটিকে গোটা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়াটা কত বড় ভুল সে হিসাব হয়তো একদিন ইতিহাস করবে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে, বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, বাঙালিদের অধিকার নিয়ে যিনিই কথা বলতো পাকিস্তানিরা তারই চরিত্র হননের চেষ্টা করতো। বর্তমানে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ধরনের নোংরামির ছড়াছড়ি দেখি, সে ঘটনাকে বঙ্গবন্ধু কিভাবে ব্যাখা করতেন তা জানি না। শুধু এটুকু বলবো- নানাদিক থেকে দেশের উন্নয়ন হয়েছে সে কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই।

কিন্তু মানুষকে নিজের মতপ্রকাশ করতে গিয়ে যে ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তা সরকারের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। কারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পাখির উড়ে বেড়ানোর অধিকারের মতোই। কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরীর লেখা ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করবো- ‘আকাশ-বাতাসের ডাকে যে পক্ষী আকুল, সে কি খাঁচায় বন্দি হবে সহজে দানাপানি পাওয়ার লোভে? অন্ন-বস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়েও মুক্তি বড়, এই বোধটি মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচয়।’

এম.এস.আই খান: সাংবাদিক
This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

Add comment

Security code
Refresh

প্রিয় পাঠক, ভিন্নমতে প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু, রচনারীতি ও ভাবনার দায় একান্ত লেখকের। এ বিষয়ে টোয়েন্টিফোর লাইভ নিউজপেপার কোনোভাবে দায়বদ্ধ নয়। আপনাদের ধন্যবাদ।