আপনি দেখছেন
সর্বশেষ আপডেট: 27 মিনিট আগে

খাবার যা ছিলো তা আগেই শেষ। পানি তারও আগে। কিছুদিন ধরেই খাবার আর পানি ছাড়া একটি ছোট নৌকায় করে মহাসাগরে ভেসে বেড়াচ্ছেন আলদি নোবেল আদিলং। তাও যে সে মহাসাগর নয়, একেবারে পৃথিবীর বৃহত্তম জলধি প্রশান্ত মহাসাগরে। কিন্তু এভাবে কয়দিন? যেদিন ঝড়ের কবলে পড়ে হাজার কিলোমিটার দূরে ভেসে চলে গেলেন সেদিনও কি আলদি ভেবেছিলেন, এভাবেই তাকে ৪৯ দিন কাটাতে হবে?

aldi in sea

ইন্দোনেশিয়ার সুলাবেসি দ্বীপের বাসিন্দা আলদি। মাত্র ১৯ বছর বয়স। এই বয়সে ভয়-ডর বলতে খুব বেশি কিছু থাকে না। ‘রম্পং’ নামের একটি বিশেষ ধরনের নৌকায় মাছ ধরার কাজ করতেন। এই ধরনের নৌকার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, এতে কোনো ইঞ্জিন বা বৈঠা থাকে না। কুঁড়েঘরের মতো কাঠের ছোট একটা ছাউনি থাকে, যেটাতে নৌকার যাত্রী রাত কাটান।

এই রম্পংকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে তীর থেকে কয়েকশ’ মাইল দূরে নিয়ে গিয়ে নোঙর করে রেখে আসা হয়। সাথে দিয়ে দেয়া হয় এক সপ্তাহ চলার মতোন খাবার-পানি আর জ্বালানি। এক সপ্তাহ পর গিয়ে আবার তাকে নিয়ে আসা হয়। সারারাত রম্পং নৌকায় আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা দুলে আর গভীর সাগরের মাছ সেই আলো দেখে আকৃষ্ট হয়ে লাফিয়ে নৌকায় উঠে পড়ে।

এভাবে বেশ ভালোই চলছিলো আলদির। সারারাত ধরে মাছ ধরতেন আর দিনের বেলায় ছাউনিতে বিশ্রাম নিতেন। বিপত্তিটা বাঁধলো ১৪ জুলাই ঝড়ের রাতে। ওইদিনের ঝড় সবকিছুর পাশাপাশি এলোমেলো করে দিয়ে যায় আলদির জীবনটাকেও।

ঝড় শেষে সকালে আলদি আবিষ্কার করলেন তার নৌকা নোঙর ছিঁড়ে গভীর সাগরে চলে এসেছে। প্রথমটায় এতো ভয় পাননি আলদি। ভাবলেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। তার খোঁজে অবশ্যই লোক আসবে। কিন্তু দিন যতো যায় সেই আশা ফিকে আসে ধীরে ধীরে। এই সময়ে তার নৌকাও চলে এসেছে গভীর থেকে গভীরতম সাগরের দিকে।

একদিন খাওয়ার পানি ফুরিয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে সাগরের নোনাজল খেতে শুরু করলেন আলদি। জ্বালানি ফুরিয়ে যেতেই ছাউনি থেকে কাঠ খুলে নিয়ে আগুন জ্বালাতে লাগলেন। রাতে নৌকায় উঠে আসা মাছই ছিলো তখন তার একমাত্র খাবার।

এই সময়ে কমপক্ষে দশটি জাহাজ তার নৌকার পাশ দিয়ে যায়। অনেকবার চিৎকার করেও জাহাজগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেননি আলদি। অথবা আলদিকে দেখেও তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসেনি তারা। হতাশ আলদি নিজের ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরে মুষড়ে পড়লেন। এ সময় ক্ষণে ক্ষণে চিৎকার করে কাঁদতেন তিনি।

এভাবে ৪৯ দিন ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে ভেসে বেড়ান ইন্দোনেশিয়ার এই তরুণ। ভাসতে ভাসতে পাড়ি দেন ৩ হাজার ৭৫০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ। এক সময় আলদির নৌকা যুক্তরাষ্ট্রের শাসনাধীন গুয়ামের জলসীমায় গিয়ে পৌছে। ওই সময় জাপানগামী এমভি আর্পেগিও নামে পানামার একটি জাহাজের নজরে পড়েন আলদি। তারা তাকে উদ্ধার করে জাহাজে তুলে নেন।

aldi in sea one

উদ্ধারের পরপরই আর্পেগিওর ক্যাপ্টেন গুয়ামের কোস্টগার্ডের সাথে যোগাযোগ করেন। কোস্টগার্ড আলদিকে জাহাজের গন্তব্য জাপানের ওসাকায় নিয়ে যেতে বলেন। এরপর আলদিকে ওসাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এরই মধ্যে জাপানে অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ার কনস্যুলেটে আলদির কথা জানিয়ে যোগাযোগ করা হয়। কনস্যুলেট থেকে জরুরিভিত্তিতে সাড়া দেয়া হয়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ৬ সেপ্টেম্বর আলদিকে নিজেদের জিম্মায় নেন ইন্দোনেশিয়ার কনস্যুলেট জেনারেল। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর আলদিকে ইন্দোনেশিয়ায় তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া এক পোস্টে এই খবর জানান কনস্যুলেট জেনারেল।

ওদিকে আলদির মা জানান, ছেলের কর্মস্থল থেকে জানানো হয়েছিলো, আলদি হারিয়ে গেছে। নৌকা নিয়ে আশেপাশের সামুদ্রিক এলাকা খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি। একটা সময় ছেলেকে ফেরত পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। ছেলে হারিয়ে যাওয়ার পর অনেক দোয়া করেছেন। এখন ছেলেকে ফেরত পেয়ে খুব ভালো লাগছে। মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। বিবিসি ডট কম, ইংরেজি সংস্করণ।

Add comment

Security code
Refresh