advertisement
আপনি পড়ছেন

রাত তখন সাড়ে ৮টা। রাজধানীর মিরপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের ব্যস্ততম সড়কে বাস, রিকশা, সিএনজি, বাইক ছুটে চলছে নিজ নিজ গতিতে। হঠাৎ একটি বাস থেমে গেলো সড়কের ঠিক মাঝখানে। নিমিষেই বাসের পেছনে থাকা অন্য যানবাহনগুলোও থেমে গেল। শুরু হলো যানজট।

women driver babyঅটোরিকশা চালক বেবি

প্রথমে মনে হচ্ছিল, কোনো ট্রাফিক পুলিশ হয়তো বাসটিকে থামার জন্য সংকেত দিয়েছে। কারণ তার ঠিক সামনেই ছিল একটি ট্রাফিক সিগন্যাল। কিন্তু বাসের সামনে কোনো পুলিশ সদস্যকে চোখে পড়ল না।

সড়কে চলাচল করা সাধারণ মানুষ এবং বাসের যাত্রীরাও তাকিয়ে আছে বাসের সামনে। এবার চোখে পড়ল, বাসের ঠিক সামনে একটি অটো চার্জার রিকশা ঘোরানোর চেষ্টা করছেন এক নারী। সবার দৃষ্টি সেই নারীর দিকে। বাসের সামনে এসে হঠাৎ অটোরিকশা ঘোরাচ্ছেন জন্য বাস থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন চালক। বাসের হেলপার বেশ রেগে গেছেন।

হেলপার বার বার ওই নারী অটোরিকশা চালককে বলছেন, ‘ওই মহিলা তাড়াতাড়ি কর। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি। কোথা থেকে যে আসে এইসব! কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে নিজের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন ওই নারী। বোঝা যাচ্ছিল, তিনি অটোরিকশাটা ঘোরানোর জন্য আগে থেকে প্রস্তুত ছিলেন না। রাস্তা পার হওয়ার আগেই হঠাৎ বাসটি এসে পড়ায় তিনি বিপাকে পড়েছেন।

আশেপাশের উৎসুক মানুষের চাহনি এবং বাসের হেলপারের গালাগালি শেষে মিনিট দেড়েক চেষ্টার পর ওই নারী অটোরিকশা ঘুরিয়ে চলে গেলেন একটি গলির মধ্যে।

সেখানেই কথা হয় তার সাথে। পরনে খুব সাধারণ একটি থ্রি পিস। পায়ে এক জোড়া বার্মিজ স্যান্ডেল। ওড়না দিয়ে নিজের মাথার চুল ঢেকে রেখেছেন। গায়ের রং কিছুটা শ্যামলা। চোখে মুখে ভীষণ ক্লান্তির ছাপ।

তিনি জানান, তার নাম বেবি বেগম। স্বামী মারা গেছেন ৮ বছর  আগে। সংসারে দুই মেয়ে এক ছেলে। সবাই ছোট। তাই তাদের ভরণপোষণ ও সংসার চালাতে অটোরিকশা চালান তিনি!

বেবি বলেন, এই অটোটা আমার নিজের নয়। ভাড়া দৈনিক ৩০০ টাকা। মালিককে ৩০০ টাকা বুঝিয়ে দিয়ে যা ইনকাম করতে পারি তাতেই সংসার চালাই। চার্জার অটো হওয়ার কারণে মেইন রাস্তায় চালাতে পারি না। পুলিশ ধরে, গালাগালি করে। বাসের এত চাপাচাপির মধ্যে এসে ঠিকঠাক কন্ট্রোল করতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, ‘মাঝে মধ্যে ভুলে মেইন রোডে এসে গেলে এমন হয়। অটোরিকশায় সাইজটা একটু বড় তো, তাই যেখানে সেখানে ঘোরাতে পারি না। তখন জ্যাম লাগলে অসুবিধা হলেই মানুষ এমন গালাগালি করে।’

ছেলেমেয়েরা কী করে জানতে চাইলে বেবি বলেন, ‘বড় মেয়েটা এক বাসায় কাজ করে। ছোট মেয়েটা স্কুলে যায়। ছেলেটাও স্কুলে দেবো। কিন্তু এ বছর টাকার জন্য পারি নাই।’

কোথায় থাকেন, জানতে চাইলে বলেন, ‘গরীবের ঠিকানা দিয়ে কি হইবো স্যার। বস্তিতে থাকি। কোনোমতে বাচ্চাদের নিয়ে বাঁইচা থাকার চেষ্টা করতেছি।’

এরপর কথা শেষ না করেই অটোতে থাকা যাত্রীদের তাড়ার কারণে দ্রুত অটোরিকশা চালু করে চলে যান বেবি। মিনিট বিশেক পর আবারও সেই সড়কে চোখে পড়ল অটোরিকশা চালক বেবিকে। এবার তার রিকশায় শুধু মানুষ নয়, উঠেছে একটি টেবিলও। সেই টেবিল ধরে বসে আছেন একজন। আর রাস্তার এপাশ ওপাশ তাকিয়ে দ্রুত গতিতে অটোরিকশা চালিয়ে যাচ্ছেন বেবি।