advertisement
আপনি দেখছেন

মানুষের মতো আর কোনো সৃষ্টির ভাষায় এত বৈচিত্র, এত ঢং আছে কি-না আমাদের জানা নেই। তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিরই একটি ভাষা আছে। সে ভাষা দিয়ে নিজেদের মধ্যে যেমন যোগাযোগ করে, তেমিন যোগাযোগ করে অন্যদের মধ্যেও। যেমন- একটি কুকুর, তার ঘেউ ঘেউ ভাষা দিয়ে অন্য কুকুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আবার সে কুকুর তার মুখ ও শরীরের ভাষা দিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলে। মানুষ বুঝতে পারে, কুকুরটি কী বলতে চায়।

vasa

কুকুরের করুণ দৃষ্টি আমাদের হৃদয়ে দরদ জাগায়। আমরা আমাদের খাবারের অংশ কুকুরের দিকে ছুড়ে মারি। এই যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ এবং আরেকটি সৃষ্টি কুকুরের মাঝে ভাবের আদান-প্রদানের অপূর্ব কলাকৌশল এটাই মূলত প্রভুর সৃষ্টি ভাষা বৈচিত্রের অনুপম নিদর্শন।

একটি শিশু কাঁদলে আমরা বুঝি, তার ক্ষিধে পেয়েছে কিংবা সে রাগ করেছে, আবার একটি শিশু হাসলে বুঝি সে আনন্দে আছে, তাহলে বোঝা যাচ্ছে এ কান্না-হাসিই শিশুর ভাষা। শিশু যদি না কাঁদতো, না হাসতো তাহলে মা কীভাবে বুঝতো শিশুর এখন খওয়া প্রয়োজন!

পবিত্র কোরআনে সূরা আর রহমানে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘আর রহমান। আল্লামাল কোরআন। খলাকাল ইনসান। আল্লামাহুল বায়ান।’ পরম দয়াময় আল্লাহ তা’য়ালা। তার দয়ার প্রথম উদাহরণ হলো- তিনি মানুষকে কোরআন শিখিয়েছেন। দ্বিতীয় উদাহরণ হলো- তিনি মানুষকে ‘বায়ান’ শিখিয়েছেন।

ফারসি বায়ান শব্দের অর্থ হলো- কথা বলা, ভাষণ দেয়া, বক্তৃতা করা ইত্যাদি। আর আরবি বায়ান শব্দের অর্থ হলো- কোনো সৃষ্টির বেঁচে থাকার জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু হাতে-কলমে শিখিয়ে দেয়া। আল্লাহ পাক মানুষকে শুধু কথা বলা শিখিয়েই থেমে যাননি, তার রুহ সৃষ্টির সময় থেকেই দুনিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তে তার পাশে থেকে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন কীভাবে চললে জীবন সুন্দর হবে, শান্তির হবে...। যদিও বান্দা সব সময় মনের কান লাগিয়ে বিবেকের কষ্টিপাথরে যাচাই করে প্রভুর কথা মেনে চলে না।

বলছিলাম, ভাষার কথা। আল্লাহ তা’য়ালা ভাষা সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন ভাষা বৈচিত্র। মানুষের ভাষা এক রকম। পশুর ভাষা আরেক রকম। পাখির ভাষা আরেক রকম। বাতাসের ভাষা এক রকম। আগুনের ভাষা ভিন্ন রকম। আবার পানির ভাষা পুরোপুরি আলাদা। আমরা যে বলি পানি শান্ত, আগুন গরম, বাতাস মৃদু, কীভাবে বলি? ওদের ভাষা অনুভব করেই বলি।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এক সৃষ্টির সঙ্গে আরেক সৃষ্টির ভাষার অনুভূতিও ভিন্ন। এই ভিন্নতা না থাকলে জগত এত সুন্দর, এত অপরূপ, এত ভয়ঙ্কর, এত মায়াময় হত না।

গভীরভাবে ভাবতে বসলে দেখা যাবে, সৃষ্টিজুড়ে ভাষার খেলা। ভাষাহীন একটি অনুকণাও কেউ খুঁজে পাবে না। খুব গরম লাগলে আমরা অস্থির হয়ে পড়ি, খুব ঠাণ্ডা পড়লে আমরা কাতর হয়ে পড়ি, বৃষ্টির সময় আমাদের এক রকম লাগে, ঝড়ো বৃষ্টির সময় অন্য রকম লাগে। কেনো লাগে, ওই ভাষার কারণেই লাগে। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের মনের গভীর যোগ রয়েছে। যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষ মনের ভাষার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। কিন্তু মন প্রকৃতির ব্যাপারে উদাসীন নয়।

তাই তো হঠাৎ জোসনার আলো দেখলে, বৃষ্টির শব্দ শুনলে, নদীর কলকল ছলছল আওয়াজ কানে আসলে, ফুলের গন্ধ শুঁকলে অল্প সময়ের জন্যও আমাদের মন উদাস হয়ে যায়। মন উদাস হয় মূলত এ জন্য যে, মন যাকে চায়, যাকে পেলে মন কানায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠবে, তাকে না পেয়ে। যেদিন তাকে পেয়ে যাবে, সেদিন মন আর শূন্য থাকবে না, উদাস হবে না।

মন কাকে চায়, মন চায় তার প্রভুকে। প্রভুকে পেলেই মন পূর্ণ হয়ে যায়। প্রভুকে পাওয়ার জন্যই সৃষ্টিজুড়ে ভাষার খেলা ছড়িয়ে দিয়েছেন আল্লাহ তা’য়ালা। আফসোস! মানুষ বিশাল সৃষ্টিরাজ্যের ভাষা বৈচিত্র ভুলে যান্ত্রিক সভ্যতার গোলামে পরিণত হয়েছে। তারা এখন অক্ষরে ভাষা নিয়ে ডুবে আছে। অথচ অক্ষরে ভাষার তাৎপর্যও তারা পুরোপুরি নিজেদের জীবনে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। হায়! কবে আমরা প্রকৃতির ভাষা বুঝে প্রকৃতির স্রষ্টা আল্লাহতে সমর্পিত হতে পারব!

sheikh mujib 2020