advertisement
আপনি দেখছেন

মহান আল্লাহতা’য়ালা বলেন, “আলিফ-লাম-রা, এই কিতাব প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞের নিকট হতে; এর আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অপর কারো ইবাদত করবে না, অবশ্যই আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সসংবাদদাতা।” (হুদ ১১: ১-২)

ramadan and al quaran 2

তিনি আরো বলেন, “আমি তো তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি যাতে তুমি ইহা দ্বারা মুত্তাকীদের সুসংবাদ দিতে পার এবং বিতর্ক প্রবণ সম্প্রদায়কে উহা দ্বারা সতর্ক করতে পার।” (মারইয়াম: ১৯: ৯৭)

কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে শানে নুযুল বা নাযিলকাল জানার জরুরত:

আল-কুরআন একবারে বই আকারে নয়, বরং নবী (সা.)-এর নবয়তী জীবনের ২৩ বছরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে। সেভাবেই আল্লাহর নির্দেশে রসুল (সা.) কুরআনের বিভিন্ন অংশ জানিয়ে গেছেন। হাফেজগণ সেভাবেই কুরআন হিফজ করেছেন এবং ওহী লেখকগণ সে অনুযায়ী কুরআন লিখেছেন। আর সেই ধারাক্রম অনুযায়ীই প্রথম খলিফা আবু বকরের (রা.) সময় পুস্তক আকারে কুরআন সংকলিত হয়।

-কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে তাই রসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তী জীবন সামনে রাখা দরকার। কোনো একটা বিষয়ে সামগ্রিক ধারণা লাভ ও বুঝ পরিষ্কার করার জন্য নাযিলের প্রেক্ষিত জানতে হবে। একে শানে নুযুল বলা হয়।

মক্কী জীবন ও মাদানী জীবন:

রসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তী জীবনকে মক্কী জীবন ও মাদানী জীবন এই ২টি ভাগে ভাগ করা হয়।

১. মাক্কী জীবন: রসুলু্ল্লাহ (সা.)-এর মক্কী জীবন মোট ১৩ বছর। নবুয়ত লাভের পর থেকে মদীনায় হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত এ সময়। দাওয়াতী কাজের বিভিন্ন স্তরের দিকে দৃষ্টি রেখে একে মোট ৪টি ভাগে ভাগ করা হয়।

১.১ গোপন দাওয়াত: প্রথম ৩ বছর। এ সময় রসূলুল্লা (সা.) তার বাছাই করা বিশস্ত লোকদের দাওয়াত দিতেন। গোপনীয়তা সত্ত্বেও বিষয়টি জানাজানি হয়ে পড়ে। কুরাইশরা প্রাথমিক অবস্থায় একে উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় নাযিল হওয়া সুরাগুলিতে দুনিয়া ও আখিরাতের বাস্তবতা, আত্মার পরিশুদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে আয়াত নাযিল হয়।

১.২ প্রকাশ্য দাওয়াত: পরবর্তী ২ বছর। সুরা শুয়ারার (২৬ নং সুরা) ২১৪ আয়াতে রসুল (সা.)-কে নিকটাত্মীয়দের দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এ সময় থেকে রসুল (সা.) প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতে শুরু করেন। কুরাইশরা এর বিপরীতে প্রাথমিকভাবে নানা অপবাদ, টিটকারী, বিরূপ প্রচারণা ইত্যাদি চালাতে থাকে। এ পর্যায়ের শেষ দিকে দুর্বল মুমিনদের উপর তারা নির্যাতন শুরু করে। ৪র্থ বছর রসুলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশে মুসলমানগণ প্রথমবারের মতো আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন।

১.৩ নির্যাতন শুরু-পরবর্তী ৫ বছর: এ সময় নতুন মুসলমানদের উপর নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। আবিসিনিয়ায় ২য় হিযরত সংঘটিত হয়। মুসলমানদের ধরে আনার জন্য কুরাইশরা আবিসিনিয়ার শাসক নাজ্জাসীর কাছে দূত পাঠায়। দূত ব্যর্থ হয়। বরং নাজ্জাসী ইসলাম কবুল করেন। এ অবস্থায় নির্যাতন বাড়তে থাকে।

১.৪ চরম নির্যাতন শেষ ৩ বছর: রসুল (সা.)-এর দুই প্রভাবশালী সমর্থক তার স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালেব ইন্তেকাল করেন। ফলে নির্যাতন চরম মাত্রা ধারণ করে। রসুল (সা.) তায়েফে যান সমর্থন ও সাহায্যের আশায়। তারা তার সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে। এ পর্যায়ে হজ্জের মওসুমে মদীনাবাসীদের এক ক্ষুদ্র দলের কাছে রসুল (সা.) গোপনে দাওয়াত পেশ করেন। তারা দাওয়াত কবুল করে এবং পরবর্তী ২ বছর দুই দফা মদীনাবাসীগণ হজ্জের সময় রসুল (সা.)-এর উপর ঈমান আনা, তাকে সাহায্য করা ও আশ্রয় দানের জন্য বায়াত করে। রসুল (সা.)-কে এ সময় মিরাজে নিয়ে যাওয়া হয়। এ পর্যায়ের শেষ ভাগে এসে প্রথমে সাহাবীরা এবং সর্বশেষে নবী (সা.) মদীনায় হিযরত করেন।

-মক্কী জীবন ইসলামী দাওয়াতের প্রস্তুতি পর্ব। দাওয়াতী মিশনের জন্য লোক তৈরির পর্যায়। এ জন্য এ সময় ঈমানের বুনিয়াদী বিষয় যেমন- তাওহীদ, রেসালাত, আখিরাত, উন্নত নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রজনীয়তা এবং জাহেলী সমাজের বিভ্রান্তি ও কুসংস্কারের অসারতা তুলে ধরা হয়েছে।

-এ পর্যায়ে লক্ষ্যণীয় দিক হল- প্রাথমিক মুসলমানরা ইসলামের জন্য নিবেদিত কর্মী হিসেবে গড়ে উঠেন। এরাই পরবর্তীতে ইসলামী সমাজ গঠন ও রসুলুল্লাহর (সা.) পরে তা এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব প্রদান করেন।

২. মাদানী জীবন: হিযরতের পরবর্তী ১০ বছর। এটি হল ইসলামী জীবনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তব রূপ দানের সময়। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধ-সন্ধি প্রভৃতি বিষয়ে এ সময় হেদায়াত এসেছে। সাথে সাথে ঈমানের দাবির ব্যাপকতা, শিরকের অসারতা ও তাওহীদের পক্ষে যুক্তি, দুর্বল ঈমানদার ও মুনাফিকদের প্রসঙ্গ, ঈমানদারদের সত্যিকার অর্থে ঈমানী দাবি পূরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

মক্কী ও মাদানী সূরা:

-নবুয়তের পর থেকে হিযরতের পূর্ব পর্যন্ত নাযিল হওয়া সুরাগুলি মক্কী সুরার অন্তর্ভুক্ত তা সে যেখানেই নাযিল হোক না কেন।

-হিযরতের পর থেকে রসুল (সা.)-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত যে সুরাগুলি নাযিল হয়েছে সেগুলো মাদানী সুরা। যদিও বা সেগুলো মক্কা বা তার আশপাশে নাযিল হয়।

-আল-কুরআন একটা জীবন্ত আন্দোলন। নবী (সা.)-এর জীবনের সাথে তা ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। তাই নবী (সা.)-এর জীবন বা সীরাত সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে কুরআন বুঝা সম্ভব নয়। কোনো আয়াতের নাযিল হওয়ার সময় ও প্রেক্ষাপট জানা না থাকলে বিভ্রান্তির সম্ভবনা তৈরি হয়। যেমন- সুরা বাকারার ১৯১ আয়াত। এ আয়াতে যুদ্ধাবস্থায় করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তদুপরি আয়াতে উল্লেখিত আছে কি প্রেক্ষিতে যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে। ইসলামবিরোধীরাই মুসলমানদের উপর আগে হামলা করেছে, তাদের পবিত্র ভূমি মক্কা ও তাদের বাড়ি-ঘর থেকে উচ্ছেদ করেছে। তথাপি কিছু মানুষ এ সব আয়াত out of context তথা প্রেক্ষাপট উল্লেখ না করে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করে। সহজ-সরল মুসলমানরাও কুরআন সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার কারণে এসব প্রচারণার শিকার হয়ে পড়ে।

কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে ইতিহাসের গুরুত্ব:

কুরআন মজীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইতিহাস। কুরআনে আমরা রসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর চলমান ঘটনাবলীর ইতিহাস পাই। তাই আল-কুরানকেই নবী (সা)-এর প্রথম ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সীরাত বা জীবনী বলা হয়। সেই সাথে কুরআনে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ইতিহাসের ব্যাপক উল্লেখ পাই আমরা। বিশেষত: মক্কী সুরাগুলিতে ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানের তাগিদ পাই খোদ সুরা ফাতিহাতে। "আন আমতা আলাইহিম"- নেয়ামত প্রাপ্তগণ কারা তা জানতে গেলে ইতিহাস জানতে হবে। একইভাবে মাগদুবে আলাইহিম (গজব প্রাপ্ত জাতিসমূহ) ও দো-ললীন (বিভ্রান্ত জাতি-গোষ্ঠীসমূহ)-সম্পর্কে না জানলে বা ভুল জানলে বিভ্রান্তির শিকার হতে হবে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে-

"রসুলদের ওই সব বৃত্তান্ত আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি যা দিয়ে আমি তোমার আত্মাকে দৃঢ় করি, এর মাধ্যমে তোমার কাছে এসেছে সত্য এবং মুমিনদের জন্য এসেছে উপদেশ ও সাবধানবাণী।" (হুদ ১১: ১২০)

শনিবার-ওয়ালাদের কাহিনী বর্ণনা শেষে বলা হয়েছে-

"আমি ইহা তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য দৃষ্টান্ত ও মুত্তাকীদের জন্য উপদেশস্বরূপ করেছি।" (বাকারা ২: ৬৬)

এটাই আল-কুরআনের ইতিহাস-দর্শন।এর মধ্যে উম্মতে মহাম্মাদীর জন্য আদর্শ ও শিক্ষা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির বাস্তব নমুনা ও করণীয় বিষয়ে হেদায়াত দান করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শেষ কথা, ইতিহাস জাতির জন্য খুবই জরুরী বিষয়। ইতিহাসের পথ বেয়েই মানুষ বর্তমানে উপনীত হয়। বর্তমান, কিছু সময় পরেই ইতিহাস হয়ে যায়। ইতিহাসই ভবিষ্যত। এজন্য ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা কঠিন অপরাধ। ইতিহাস না জানলে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসী হয় মুক্তিযোদ্ধা। গুণ হয়ে যায় দোষ, দোষী হয়ে পরে মহিমান্বিত। মুসলিম উম্মাহ আজ নিজের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ হয়ে আছে। বরং অন্যের মনগড়া ইতিহাসের আলোকে সে নিজেকে বিচার করে। আফ্রিকার কোনো কোনো উপজাতীর মধ্যে নাকি এ কথা প্রচলিত আছে, ‘যতদিন পর্যন্ত সিংহদের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক না জন্মাবে ততদিন পর্যন্ত সিংহ শিকারে মানুষের গৌরবগাঁথাই লেখা হতে থাকবে।’

কল্পনা করুন দেখি, সিংহদের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক থাকলে সিংহ শিকার সমন্ধে তারা কি বলতো? বলতো- প্রথমে তারা আমাদের এলাকা ছাড়া করলো, তারপর আমাদের খাদ্য তথা শিকারে ভাগ বসালো। এরপর একদিন শ’দুয়েকের বেশি লোক আমাদের এলাকা ঘেরাও করে ফেললো। তারপর আমাদের এক ভাইকে কোণঠাসা করে কাপুরুষের মতো দূর থেকে তীল ধনুক-বল্লম বা বন্দুক দিয়ে মেরে ফেললো। তা সত্ত্বেও আমাদের ভাই বীরের মতো সংগ্রাম করলো। তাদের পাঁচজনকে হালাক আর সাতজনকে গুরুতর জখম করে বীরের মতো প্রাণ দিলেন। এমনটাই বা এর কাছাকাছি লেখা হতো সিংহের সেই ইতিহাসে। কিন্তু মানুষ শুধু শিকারের নেশায় নিজের বীরত্ব জাহির করার জন্য দূর থেকে হাতিয়ার ছুড়ে শিকার করে, অতঃপর শিকারের মরদেহের উপর পা তুলে ছবি উঠায়। বীরত্ব জাহির করে।

এভাবেই ইতিহাসের যথার্থ চর্চার অভাবে আফ্রিকার মুসলিম রাজপুত্র আমেরিকায় বিক্রি হয়ে গেল দাস হিসেবে। পরিচিত হল- দাস মালিকদের দেয়া নতুন নামে। সে নিজের পরিচয় হারিয়ে আজ আন্দোলন করছে Black lives matter. আবার একই সাথে তাদের এক বিরাট অংশ তাদের পূর্ব পরিচয় ও মুক্তির পর ইসলামের বিরোধিতা করছে। একইভাবে আর্যরা এদেশ দখল করে ভূমিপুত্রদের দাস তথা নমশুদ্রে পরিণত করলো। জারি করলো বর্ণাশ্রম প্রথার নামে মানুষকে দাস বানানোর ধর্মীয় বিধান। বাবা আম্বেদকার ভারতীয় সংবিধান প্রণয়ন করলেন, কিন্তু আজও তার জাতি ‘দলিত’ হিসেবে নির্যাতিত-নিপীড়িত।

বিশ্ববাসীকে জ্ঞানের পথ, আলোর পথ, কল্যাণের পথ দেখালো যে মুসলিম তারা আজ সন্ত্রাসী। তাদের স্বর্ণযুগকে নাম দেয়া হল মধ্যযুগ। যা কিছুই খারাপ তার সাথে মধ্যযুগ জুড়ে দেয়া হল। মানব জাতির ইতিহাস থেকে মুসলমানদের উত্থান যুগের ছয় থেকে সাত শত বছরের ইতিহাস শ্রেফ মুছে দেয়া হল। মুছে দেয়া হল জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবিস্মরণীয় ও অপরিহার্য অবদানকে। আছেন কি কেউ? শুনতে পান? আর কতকাল এই আলস্য আর শিথিলতা। আসুন, জাগুন, নিজ পরিচয় জানুন- আল্লাহর কিতাব থেকে। নবীর (সা.) সুন্নাহ থেকে। নবীর (সা.) বৃথা নয়- তোমাদের জন্য আমি দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি- আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ। যতদিন তোমরা এ দুটি শক্তভাবে আকড়ে থাকবে ততদিন তোমরা পথ হারাবে না। (মুসনাদে আহমাদ, মুয়াত্তা মালিক)।