advertisement
আপনি দেখছেন

ইউরোপিয়ান ফুটবলের একটা সৌন্দর্য্য আছে। কখনো কখনো এটা ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের চেয়েও অনিশ্চয়তায় ভরপুর। জার্মানি এবং ইতালির কথাই ধরুন। দুটো দলই সমান চারবার করে সোনালি ট্রফি জিতেছে। কিন্তু রুপালি ট্রফিটা এতবার জেতা হয়নি তাদের। জার্মানরা ইউরোর স্বাদ পেয়েছেন তিনবার। সবশেষ ১৯৯৬ সালে।

euro 2020 players

এরপর আর ইউরোপ সেরা হতে পারেনি জার্মানি। অথচ এই ২৫ বছরে দুবার বিশ্বজয়ের সুযোগ এসেছে তাদের। একবার হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। আর ইতালি? তাদের কাছে তো এই টুর্নামেন্ট বিরাট একটা রহস্য হয়ে উঠেছে। ১৯৬৮ সালে প্রথম ও শেষবারের মতো ট্রফি জয়। বিস্ময়কর হচ্ছে, গেল ৫৩ বছরে চারবার বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চে উঠেছে আজ্জুরিরা।

দুবার জিতেছে সোনালি ট্রফি। কিন্তু ইউরোর দ্বিতীয় ট্রফি জয়ের প্রতীক্ষার প্রহর আর শেষ হলো না ইতালিয়ানদের। ২০০০ ও ২০১২ সালে অবশ্য ইউরোর ফাইনালে উঠেছিল তারা। কিন্তু ফ্রান্স আর স্পেনের কাছে স্বপ্ন জমা দিয়ে আসতে হয়েছে ইতালিকে। এবার যে তারা ইউরোর মুকুট ঘরে তুলতে পারবে সেটার নিশ্চয়তা নেই।

ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের বয়স ৯০ পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে ফুটবল মহাযজ্ঞ হয়েছে ২১টি। যেখানে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আটটি দল। ইংল্যান্ড ও স্পেন একবার করে জিতেছে। বাকি ছয় দল অন্তত দুবার বিশ্বজয় করেছে। সেখানে ৬০ বছরের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের চ্যাম্পিয়ন দল হয়ে গেছে ১০টি! ইউরো কতটা অনিশ্চিত তা বোঝাতে এই তথ্যটাও যথেষ্ঠ।

এতসব আলোচনার অর্থ একটাই, আজ থেকে শুরু হওয়া ইউরো টুর্নামেন্টের নির্দিষ্ট দুই-একটা দল নেই যারা অবধারিতভাবে ট্রফি জিততে পারে। ফেভারিটের তমকা আছে কয়েকটা দলের গায়ে। কখনো শিরোপা জিততে না পারা ইংল্যান্ড আর বেলজিয়ামও আছে দৌড়ে। স্পেন, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসকেও ফেভারিট মানা হচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ফুটবলে সেরা দলের চ্যাম্পিয়ন গৌরব খুব কমই আছে। তেমনটা না হলে ২০১৮ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হতে পারতো ব্রাজিল কিংবা বেলজিয়াম। ইউরোতেও ব্যাপারটা এমনই। যার দৃষ্টান্ত ২০০৪ সালে ইউরো আসর। সবাইকে একরাশ বিস্ময় উপহার দিয়ে স্বপ্নের রুপালি ট্রফি জিতে নিয়েছিল গ্রিস। ১৯৯২ সালে ডেনমার্ক। ১৯৭৬ সালে চেক প্রজাতন্ত্র।

এবারো যে কেউ গ্রিস, ডেনমার্ক কিংবা চেক প্রজাতন্ত্র হয়ে উঠতে পারবে না তা কিন্তু নয়। নতুন কোনো দলের হাতেও উঠতে পারে ‍মুকুট। বড় দলগুলোর মধ্যে এই মুহূর্তে বেলজিয়াম এবং ইংল্যান্ডেরই ইউরো জয়ের নজির নেই। বেলজিয়ানরা অবশ্য ১৯৮০ সালে তীরে এসে তরি ডুবিয়েছিল। আর বিশ্বজয়ী ইংল্যান্ড তো কখনো এই মঞ্চের ফাইনালেই উঠতে পারেনি!

হ্যাঁ, এটাই ইউরোপিয়ান ফুটবল। যাদের রাজ সাম্প্রতিক কয়েকটি বিশ্বকাপে দেখা গেছে। এখানে কে যে কখন কার স্বপ্ন ভেঙে তা বলা মুশকিল। অনিশ্চয়তায় ভরপুর সেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ১৬তম আসরের পর্দা উঠছে আজ রাতে। বাংলাদেশ সময় রাত নয়টায় উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে উঠতি শক্তি তুরস্ক ও জায়ান্ট দল ইতালি।

এই টুর্নামেন্ট শুরুর কথা ছিল ২০২০ সালের ১১ জুন। কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে তা পিছিয়ে যায় এক বছর। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এই প্রথম দুটি আসরের সময়ের ব্যবধান হলো চার বছরের বেশি। এবারো যে টুর্নামেন্ট ঠিক সময়ে উয়েফা শুরু করতে পারছে এটা একটা বড় প্রাপ্তি। কারণ এখনো করোনার আগ্রাসনে কাঁপছে বিশ্ব!

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আরেকটা বড় স্বস্তি হচ্ছে, মাঠে গিয়ে খেলা দেখতে পারবেন তারা। তবে স্টেডিয়াম টইটুম্বুর হওয়ার সুযোগ নেই। করোনা ঝুঁকি এড়াতে গ্যালারির বেশিরভাগ আসন থাকবে ফাঁকা। তাতে ইউরোর রোমাঞ্চ অনেকটাই ধূসর হয়ে গেছে। মাঠবিমুখ দর্শকদের অত ভাবনার কারণ নেই। তবে উপমহাদেশের দর্শকদের বিড়ম্বনা হচ্ছে- রাত জেগে দেখতে হবে খেলা। নিখাদ বিনোদনের স্বার্থে ঘুমের একটু জলাঞ্জলি তো দিতে হবেই!

এবারের ইউরো আরেকটা জায়গায় ব্যতিক্রম। প্রথমবারের মতো একক দেশে আয়োজন হচ্ছে না টুর্নামেন্ট। ইউরোপের ১১টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে ৫১টি ম্যাচ। আজ রোমের বিখ্যাত অলিম্পিকো স্টেডিয়াম থেকে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ হবে লন্ডনের ঐতিহাসিক ওয়েম্বলি স্টেডিয়িামে। সেমিফাইনালের দুই ম্যাচের মঞ্চও ওয়েম্বলির দুর্গ।

বাকি নয়টি ভেন্যুর শহর হচ্ছে- বাকু, কোপেনহেগেন, সেন্ট পিটার্সবার্গ, বুখারেস্ট, অ্যামস্টারডাম, গ্লাসগো, সেভিয়া, মিউনিখ ও বুদাপেস্ট। ‍খুব স্বাভাবিকবাবেই অংশ নেওয়া ১১টি দেশ ঘরের মাঠে কয়েকটা ম্যাচ খেলার বাড়তি অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। তবে এটা নিশ্চিত ২৪ দলের বেশিরভাগ দলেরই স্বপ্ন ১২ জুলাই ফাইনালের মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার।

সবশেষ নিজগৃহে পরবাসী হয়েছে ফ্রান্স। ২০১৬ সালে নিজেদের আঙিনায় ফাইনালে পর্তুগালের কাছে হেরে যায় ফ্রান্স। স্বপ্নের প্রথম ট্রফি জেতে পর্তুগিজরা। তাতে গেল দেড় দশকের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দায় অনেটাই মিটিয়েছে ফুটবল। ঘরের মাঠে শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার সেই দুঃখ অবশ্য ২০১৮ বিশ্বকাপ জিতে ঘুচিয়েছে ফরাসিরা। এবার ইউরোর রাজত্ব উদ্ধারের পালা।

গত আসর পাহাড়সম প্রত্যাশার চাপ নিয়ে খেলেছেন রোনালদো। এবার অনেকটাই নির্ভার ‘সিআর সেভেন’। পর্তুগাল দলে আছেন একঝাঁক প্রতিভা এবং অভিজ্ঞ ফুটবলার। শিরোপা ধরে রাখার কাজটা কঠিনতর হলেও আশা আছে পর্তুগালের। কাগজে-কলমের শক্তিমত্তা হিসেব করলে শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা বেশি বেলজিয়ামের। পিছিয়ে নেই ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেনও।

গত বিশ্বকাপের টিকিট না পাওয়া ইতালির পুনর্জন্ম হয়েছে গেল তিন বছরের মধ্যে। বাছাইপর্বের ১০ ম্যাচের সবকটিতে জিতে ইউরোর মূলপর্বে উঠেছে আজ্জুরিরা। পাওয়ার হাউজ জার্মানি উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে বিদায় নিয়ে ইতিহাসের দুষ্টচক্রে আটকে যাওয়া জার্মানরা ইউরোতে দারুণ কিছু করতে মরিয়া।

ইতালির মতো পুনরুত্থান হয়েছে নেদারল্যান্ডসেরও। শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে তারাও। সমশক্তির কয়েকটা দল ডেনমার্ক, ইউক্রেন, সুইজারল্যান্ড, ওয়েলস, সুইডেন, পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, তুরস্ক, রাশিয়ার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সবমিলিয়ে রোমাঞ্চকর এক আসর শুরুর অপেক্ষায় ইউরো। অপেক্ষা আর তো কয়েক ঘণ্টার।

তবে গ্রুপপর্বে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হবে তিন চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল, ফ্রান্স ও জার্মানিকে। তিনটি দলই পড়েছে মৃত্যুকূপ খ্যাত ‘এইচ’ গ্রুপে। গ্রুপের তৃতীয় সেরা হওয়া দলটারও সুযোগ থাকতে পারে নকআউট পর্বে ওঠার। সেক্ষেত্রে আবার অন্য গ্রুপের সঙ্গে মারপ্যাচ ও হিসেব নিকেশ। অমন জটিলতায় আসলে যেতে চাইবে না কেউ-ই।