advertisement
আপনি দেখছেন

মেসি-নেইমার-এমবাপ্পে। পিএসজির এই দুধর্ষ ‘এমএনএম’ ত্রয়ী’কে সহায়তা করতে পেছনে আছেন তিন আর্জেন্টাইন-অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া, মাউরো ইকার্দি ও নিয়ান্দ্রো পারদেস। বর্তমান বিশ্বের তো বটেই, পিএসজির এই আক্রমণভাগ বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেরই সেরা আক্রমণভাগ কিনা, সেই আলোচনাও আছে।

mbappe messi neimerনেইমার, মেসি ও এমবাপ্পে

আলোচনাটাকে আরও উসকে দিয়েছিল পিএসজির মৌসুম শুরুর পারফরম্যান্স। মৌসুমের শুরু থেকেই আকাশে উড়ছিল মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেদের পিএসজি। জিতেছে ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ানে প্রথম ৮ ম্যাচেই। সেই ৮ ম্যাচে মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেদের দল করেছে ২২টি গোল। বিপরীতে হজম করে মাত্র ৭টি। স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা জমাট বাধছিল পিএসজির এই ভয়ংকর আক্রমণভাগকে রুখে, সাধ্য কার!

সেই সাধ্য গত রাতে দেখিয়ে দিল পুঁচকে রেঁনে। রেঁনে শুধু রুখে দেয়নি, মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেসহ পিএসজির পুরো আক্রমণভাগকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কাঠগড়ায়। গত রাতে যে রেঁনের কাছে মৌসুমে প্রথম হারের তেঁতো স্বাদ গিলতে হয়েছে তারকাখচিত পিএসজিকে, সে তো মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেসহ পুরো আক্রমণভাগের ব্যর্থতাতেই!

হ্যাঁ, অতিথি হিসেবে ডেকে নিয়ে উড়তে থাকা পিএসজিকে হারিয়ে দিয়েছে রেঁনে। নিজেদের ঘরের মাঠে তারা জিতেছে ২-০ গোলে। শুধু লিগে নয়, সবধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়েই এটা মৌসুমে প্রথম হার পিএসজির। মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেদের পিএসজিকে রুখে দেওয়ার প্রথম উদাহরণটা অবশ্য তৈরি করেছে ক্লাব ব্রুজ। গত ১৫ সেপ্টেম্বর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে বেলজিয়ান ক্লাবটি দূরন্ত পিএসজিকে রুখে দেয় ১-১ গোলে। তবে রেঁনে একধাপ এগিয়ে পিএসজিকে হারিয়েই দিল। সেটিও নিজেদের গোলপোস্ট ক্লিন সিট রেখে! মানে নিজেরা কোনো গোল হজম না করে। যার অর্থ-মেসি, নেইমার, এমবাপ্পেসহ পিএসজির পুরো আক্রমণভাগকেই বোতলবন্দী রাখার সাধ্য দেখিয়েছে তারা!

ক্লাব ব্রুজের ধাক্কা সামলে লিগ এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মিলিয়ে পরের দুই ম্যাচেই জয় তুলে নেয় পিএসজি। গত রাতেও পিএসজির আর্জেন্টাইন কোচ মরিসিও পচেত্তিনো পূর্ণ শক্তির দলই নামিয়েছিলেন মাঠে। জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে শুরুর একাদশেই মাঠে নামিয়েছিলেন মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেসহ অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়াকেও। পরে বদলি হিসেবে মাঠে নামিয়েছেন ইকার্দিকেও। কিন্তু মেসি, নেইমার, এমবাপ্পে, ডি মারিয়া, ইকার্দি-কেউই রেঁনের রক্ষণ জাল ছিঁড়ে দলকে একবারও হাসাতে পারেননি। সবাই ব্যর্থ! ব্যর্থতার গ্লানির সঙ্গে প্রত্যেকেই সুযোগ মিসের অভিযোগে অভিযুক্ত। গোলের সুযোগ মিস করেছেন এমবাপ্পে, মেসি, নেইমার, ইকার্দি, ডি মারিয়া-সবাই।

এই সুযোগে মিসের ভিত্তিতেই উপরের শিরোনামটি দাঁড় করানো হয়েছে। কারণ, কাল সুযোগ মিসের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফরাসি বিস্ময়বালকই নষ্ট করেছেন সবচেয়ে বড় সুযোগগুলো। একবার তো রেঁনের গোলরক্ষককে একা পেয়েও তিনি শট মেরেছেন পোস্টের উপর দিয়ে! তার সুযোগ মিসের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ভিএআর (ভিডিও এসিস্ট্যান্ট রেফারি)। একবার বল রেঁনের জালে জড়িয়েছিলেন তিনি।

সতীর্থদের নিয়ে উদযাপনও শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেই উদযাপন বানচাল করে দিয়েছে ভিএআর। ভিডিও দেখে রেফারি জানিয়ে দেন, মেসির প্রথম পাস ধরার আগে অফসাইডের খগড়ে পা রেখেছিলেন এমবাপ্পে, গোল বাতিল। এমবাপ্পের হতাশা আরও বাড়ে। ম্যাচ শেষে ফরাসি তারকার সেই হতাশায় আরও গাঢ় প্রলেপ দিয়েছে একটা পরিসংখ্যান, এ নিয়ে সর্বশেষ ৫ ম্যাচে গোল করতে ব্যর্থ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ তারকা এমবাপ্পে।

সুযোগ এমবাপ্পেই বেশি মিস করেছেন। তবে মেসি-নেইমারসহ অন্যরাও এই দোষে দোষী হয়েছেন কাল। ব্যর্থতার রাতটিতে পিএসজির আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা কতটা ব্যর্থ ছিলেন, সেটি ছোট্ট একটা তথ্যেই স্পষ্ট। পুরো ম্যাচে পিএসজির খেলোয়াড়েরা প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে একটি শটও নিতে পারেননি। সব মিলে ম্যাচে ১৪টি শট নিয়েছেন মেসি, নেইমার, এমবাপ্পেরা। সবগুলোই মেরেছেন পোস্টের বাইরে বা উপর দিয়ে। কাছাকাছি বলতে ম্যাচের ৩১ মিনিটে মেসির একটা ফ্রি-কিক প্রতিহত হয় পোস্টে। আর এমবপ্পের যে শটটি পোস্টে ছিল, মানে রেঁনের গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে জালে চুমু খেয়েছিল, সেটি তো ছিল অফসাইডই।

মেসি, নেইমার, এমবাপ্পে, ডি মারিয়াদের সঙ্গে সুযোগ মিসের কাঠগড়ায় চড়েছেন ৭৬ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা ইকার্দিও। তবে দলের হারের দায় বিবেচনায় নিলে খেলোয়াড়দের চেয়েও বড় আসামী হয়তো পিএসজির আর্জেন্টাইন কোচ স্বয়ং মরিসিও পচেত্তিনো! পিএসজির আর্জেন্টাইন কোচ অনেকবারই ভুল কৌশলের কারণে সমালোচিত হয়েছেন। গত রাতেও তার ভুল কৌশল এবং ভুল বদলি নীতি স্পষ্ট চোখে পড়েছে।

মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেকে আক্রমণে নামিয়ে ডি মারিয়াকেও শুরুর একাদশে রাখার সিদ্ধান্তটা কতটা যৌক্তিক সেই প্রশ্ন আছেই। তবে কোচ পচেত্তিনো সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছেন ৭৬ মিনিটে বদলির সিদ্ধান্তে। একসঙ্গে ইতালিয়ান মিডফিল্ডার মার্কো ভেরাত্তি, নেইমার ও ইদ্রিসা গেয়ে-তিনজনকে বদলি করেন পচেত্তিনো। তাদের তিনজনকে তুলে মাঠে নামিয়ে দেন ভাইনালডাম, এরেরা ও ইকার্দিকে।

দল ২-০ গোলে পিছিয়ে। এমন অবস্থায় নেইমারকে তুলে নিয়ে তার জায়গায় ইকার্দিকে নামানো-কোচের সিদ্ধান্তটা যে নেইমারেরও পছন্দ হয়নি, সেটি তিনি মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ই বোঝা গেছে। কোচের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ব্রাজিল তারকা শান্তভাবেই মাঠে ছেড়েছেন বটে, তবে তার চোখে-মুখে হতাশার ছাপটা ছিল স্পষ্ট।

বদলি তো করেছেন। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে পচেত্তিনোর পরের কৌশলও। ভেরাত্তি-নেইমারকে তুলে নেওয়ায় ‘স্বাধীন ফরোয়ার্ড’ মেসি একা হয়ে পড়েন। মূল স্ট্রাইকারের ভূমিকা থেকে সরিয়ে এমবাপ্পেকে খেলার নির্দেশ দেন লেফট-উইঙ্গার হিসেবে। তাতে এমবাপ্পের দাপট আরও কমে যায়। কারণ, সুযোগ মিসে এগিয়ে থাকলেও নেইমাররা উঠে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এমবাপ্পেই ছিলেন পিএসজির খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে চটপটে, উজ্জ্বল। কিন্তু পজিশন বদলে যাওয়ায় এমবাপ্পের ধার কমে যায়। ধার কমে যায় পিএসজির আক্রমণেও।

মোদ্দাকথা, মৌসুমের প্রথম হারের দায়টা পিএসজিকে দলগতভাবেই নিতে হচ্ছে। আর পিএসজির এই দলগত ব্যর্থতার দিনে রেঁনে অন্য সব প্রতিপক্ষদের দেখিয়ে দিয়েছে, ইচ্ছার সঙ্গে চেষ্টাকে মেলালে পিএসজিকে হারানো সহজ! মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেদের মাঠে অকার্যকর রাখা আরও বেশি সহজ!

মেসি-নেইমার-এমবাপ্পের যুগপত ব্যর্থতার দিনে রেঁনে গোল দুটো করেছে প্রথমার্ধের ঠিক শেষ এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে। খেলার ধারার বিপরীতে ঠিক ৪৫ মিনিটে এক প্রতিআক্রমণ থেকে রেঁনেকে প্রথম এগিয়ে দেন লাবোর্দে। গোলের পরপরই রেফারি বাজিয়ে দেন বিরতির লম্বা বাঁশি। বিরতি থেকে ফিরে প্রথম মিনিটেই আবার রেঁনের গোলউৎসব। ৪৬ মিনিটে ব্যবধান ২-০ করেন টেইট। গোল পরিশোধের জন্য মেসি-এমবাপ্পে-নেইমাররা ৪৪ মিনিট সময় পেয়েছিলেন। যোগ করা সময়ের ৬ মিনিট যোগ করলে পিএসজির সময় পেয়েছিল ৫০ মিনিট। কিন্তু দীর্ঘ সময় এই সুযোগ মিসের মহড়া দিয়েই শেষ করেছেন মেসি-এমবাপ্পেরা।

হারের পরও ৯ ম্যাচে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে স্পষ্ট ব্যবধানেই শীর্ষে পিএসজি। সমান ম্যাচে ১৮ পয়েন্ট দুই নম্বরে লেস। আর রেঁনে? অসাধারণ এই জয়ের পরও ৯ ম্যাচে ১২ পয়েন্ট নিয়ে তাদের অবস্থান ১১ নম্বরে। কাল তারা পেয়েছে তৃতীয় জয়। মানে আগের ৮ ম্যাচের মাত্র ২টিতে জেতা দলটিই মাটিতে নামিয়েছে তারকায় ঠাসা পিএসজিকে।