advertisement
আপনি পড়ছেন

ইউক্রেন সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র জড়াবে না বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দাবি করলেও তার দেশের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইউক্রেনীয় বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রশিক্ষণ দিয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করছে। একইভাবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর একদল কমান্ডো ইউক্রেনীয় বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্র ও আক্রমণ সমন্বয়ে সহযোগিতা করছে। নিউইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।

ukraine training tlsd ইউক্রেনের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ সৈন্যরাই যুদ্ধক্ষেত্রে বেশি সংখ্যায় প্রাণ হারাচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলো ইউক্রেনকে সহযোগিতার সিংহভাগ কাজ জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি থেকে করলেও সিআইএ ও ন্যাটো কমান্ডোদের কিছু অংশ ইউক্রেনেও সশরীরে অবস্থান করছে। সিআইএর লোকজন মূলত কিয়েভে বসে ইউক্রেনীয় বাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয়ের কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা তথ্যগুলো নিশ্চিত করেছেন।

ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা, লিথুয়ানিয়াসহ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর কয়েক ডজন কমান্ডোও ইউক্রেনে স্থানীয় বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। তারা ইউক্রেনীয় সৈন্যদের সরেজমিন পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

খবরে প্রকাশ, রুশ আক্রমণ শুরুর আগে মার্কিন বাহিনীর প্রায় দেড়শ প্রশিক্ষক ইউক্রেনীয় কমান্ডোদের নিয়ে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি সামরিক ঘাঁটিতে কাজ করছিল। রুশ আক্রমণ শুরুর আগে তারা ইউক্রেন ছেড়ে যান। মার্কিন সেনাবাহিনীর ১০ম স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপের সদস্যরা এসব কার্যক্রমে অংশ নেন।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ শুরুর পর মার্কিন ১০ম স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপ ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য সামরিক সহযোগিতা সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে জার্মানিতে একটি পরিকল্পনা সেল গঠন করে। এরইমধ্যে বিশটি দেশের প্রতিনিধিরা ওই সেলে যোগ দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সেনাবাহিনী-বিষয়ক সচিব ক্রিস্টিন ওয়ারমুথ গত মাসে আটলান্টিক কাউন্সিলের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপের পরিকল্পনা সেলের কার্যক্রম সম্পর্কে আভাস দেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনকে দেওয়া অস্ত্রের চালান যাতে রুশ হামলা এড়িয়ে বিভিন্ন রুটে সেদেশে পৌঁছতে পারে, সে বিষয়ে আমরা সমন্বয়ের কাজ করছি। অস্ত্রবাহী কনভয় কোথায় হামলার শিকার হতে পারে, সে সম্পর্কেও আমরা তথ্য দিচ্ছি।

এর আগে আফগানিস্তানেও একই ধরনের পরিকল্পনা সেল গঠন করেছিল মার্কিন বাহিনী। ইউক্রেনে দ্রুত অস্ত্র পৌঁছাতে পেন্টাগনের ইউরোপিয়ান কমান্ড বেশকিছু আভিযানিক ও গোয়েন্দা সেল গঠন করেছে। তারই অংশ জার্মানিভিত্তিক এ পরিকল্পনা সেল।

এরকম আরেকটি সেল রয়েছে জার্মানিতে অবস্থিত রামস্টাইন বিমান ঘাঁটিতে। সেখান থেকে মার্কিন বিমান বাহিনী ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীকে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কৌশলগত ও কারিগরি সহযোগিতা জোগাচ্ছে। মার্কিন ন্যাশনাল গার্ডের গ্রে উলফ টিমও এ কাজে অংশ নিচ্ছে বলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন।

ইউক্রেনে অবস্থানরত ন্যাটো কমান্ডোরা সরাসরি রণক্ষেত্রে যাচ্ছেন না। তবে তারা সাংকেতিক যোগাযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রের ম্যাপিং, বিভিন্ন অ্যাপ থেকে স্যাটেলাইট ইমেজ নিয়ে রুশ বাহিনীর অবস্থান শনাক্তকরণ ও অন্যান্য কাজে ইউক্রেনীয় সৈন্যদের পরামর্শ ও নির্দেশনা দিচ্ছেন।

গত এপ্রিলে মার্কিন সিনেটে এক শুনানিতে দেশটির স্পেশাল ফোর্সেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল জোনাথন পি ব্রাগা বলেন, যে বিষয়টি অকথিত রয়ে গেছে তা হলো বেশ কয়েকটি দেশের স্পেশাল ফোর্সেসকে নিয়ে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, যা ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী ও স্পেশাল ফোর্সেসকে সহযোগিতা জুগিয়ে যাচ্ছে।

ইউক্রেনে সিআইএ প্রশিক্ষকদের উপস্থিতির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র সরকার অস্বীকার করলেও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রয়েছে। যদিও ইউক্রেনীয় বাহিনীকে তাদের দেওয়া প্রশিক্ষণ কতটা কার্যকর হবে সে বিষয়ে সন্দিহান অনেকে।

সিআইএর সাবেক পদস্থ কর্মকর্তা ও মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক উপ-পরিচালক ডগলাস এম ওয়াইজ বলেন, সিআইএর দক্ষতা মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানে। ইউক্রেনীয়দের দরকার পুরোদস্তুর সামরিক প্রশিক্ষণ। হাই-মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেমস (হাইমারস) ও অন্যান্য যেসব অত্যাধুনিক অস্ত্র আমরা সরবরাহ করছি, সেগুলো পরিচালনা করা শেখাতে হবে। সিআইএকে দিয়ে সে কাজ হবে বলে মনে হয় না।

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম দফায় ৬০ জন ইউক্রেনীয় সৈন্যকে হাইমারস পরিচালনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখন আরেকটি ব্যাচের প্রশিক্ষণ চলছে জার্মানিতে।

এছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদের উদ্ধার ও চিকিৎসায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে মার্কিন বাহিনীর গ্রিন বেরেট টিম ইউক্রেনীয় সৈন্যদের জন্য মেডিকেল ট্রেনিং কার্যক্রম শুরু করেছে।

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের প্রথম মাস পর্যন্ত মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেস ও ন্যাশনাল গার্ড ইউক্রেনের ২৭ হাজারের বেশি সৈন্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ শহরের কাছে ইয়াভরিভ কমব্যাট ট্রেনিং সেন্টারে এসব প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সামরিক কর্মকর্তারাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেনের কয়েক হাজার সৈন্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ সৈন্যরাই বেশি সংখ্যায় নিহত হচ্ছে বলে সেদেশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান। তাদের মতে, ইউক্রেনে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের এটাই সবচেয়ে প্রকট সমস্যা।