advertisement
আপনি পড়ছেন

দেশে বন্যায় এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সে তালিকায় থাকতে পারতো ব্যাংকার আব্দুল লতিফের নামটিও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে ফিরেছেন। তবে সেই দুবির্ষহ ২৬ ঘণ্টার কথা হয়তো ভুলতে পারবেন না জীবনেও।

banker abdul latifআবদুল লতিফ

আব্দুল লতিফ সুনামগঞ্জে জেলার কর্মসংস্থান ব্যাংক ছাতক শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ১৬ জুন কর্মস্থল থেকে সিলেটের বাসায় ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠেনি। বন্যার স্রোতে ভেসে গিয়েছিলেন। প্রায় ২৬ ঘণ্টা যুদ্ধ করেছেন, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। শেষে একজনের সহায়তায় বেঁচে ফিরেছেন তিনি। তার সাথে থাকা একজনকে উদ্ধার করা হয়েছিল মৃত হিসেবে।

তিনি জানান, ১৬ জুন দুপুর ২টার দিকে ছাতকের কর্মস্থল থেকে সিলেটের বাসার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন তিনি। টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ছাতক-সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গাড়ি বাদ দিয়ে তিনি একটি নৌকায় চড়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন। ঝাওয়া ব্রিজ বা মাধবপুর এলাকার যেতে চাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কিছুদূর এসে নৌকাটির গলুই ভেঙে যাওয়ায় নৌকা থেকে নেমে পানিতে দাঁড়ান তিনি।

sunamgonj floodসুনামগঞ্জের বন্যা

বিকেল ৫টা নাগাদ আরেকটি নৌকা পাওয়া যায়। তাতে উঠে বসেন তিনি। সঙ্গী আরো পাঁচজন। ১০ মিনিটের মতো না এগোতেই তীব্র স্রোতে নৌকাটি ডুবে যায়। সাঁতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হন চারজন। আর আব্দুল লতিফসহ দুইজন ভেসে যান। ২/৩ দিন পর শুনেছেন ওই লোকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল।

বন্যার পানির সাথে ভেসে যাচ্ছিলেন আব্দুল লতিফ। স্রোতের টানে জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। স্রোতের উল্টো আসার চেষ্টা করে আরো বিপদে পড়েন। দ্রুত তার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে। সাথে থাকা ফোন, স্মার্টওয়াচ, জরুরি কাগজপত্র সব ভেসে যায়।

মাথার ওপরে তখন বিরামহীন বৃষ্টি আর নিচে ঠাণ্ডা পানির তীব্র স্রোত। চারদিকে অন্ধকার। এর মধ্যে কখনো ডুবছেন কখনো ভাসছেন তিনি। আশপাশে পানির স্রোতের শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না।

এভাবে আনুমানিক চার ঘন্টা পর হঠাৎ ধাক্কা খেলেন কিছুর সঙ্গে। প্রাণপণে ধরে ফেলে কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারেন এটি একটি গাছের শিকড়। পরে আস্তে আস্তে ডালে উঠতে সক্ষম হলেন। অবর্ণনীয় কষ্ট আর উৎকণ্ঠার মধ্যদিয়ে ওই ডালে সেই রাত পার করেন তিনি। পরের দিন পাশের একটি ঘরের টিনের চালায় আশ্রয় নেন। এ সময় ক্ষুধা মেটাতে খেয়েছেন কাঁচা মাছ, লতাপাতা।

এমনিভাবে কেটে যায় বিভিষিকাময় ২৬ ঘণ্টা। দোয়ারাবাজার অঞ্চলের এ ঘর থেকেই পরবর্তী সময়ে তাকে উদ্ধার করা হয়। এক লোকের সহায়তায় তিনি এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার লাভ করেন। পরে যখন বাড়ি ফিরে এ ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখনো তার মাথা থেকে যায়নি দুর্বিষহ সেই স্মৃতি। ফলে কথা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছেন ব্যাংকের উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তা।