advertisement
আপনি পড়ছেন

গত ২৫ জুন ঢাকার আশুলিয়ার হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছাত্রীদের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলছিল। হঠাৎ মাঠের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে মাথায় আঘাত করে ওই প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষার্থী আশরাফুল আহসান জিতু। এরপর মাটিতে ফেলে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গুরুতর আহত করে শিক্ষককে।

jitu ashuliaআশরাফুল আহসান জিতু

সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে সাভারের আরেকটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৭ জুন ভোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

কয়েক দফা চেষ্টার পর অবশেষে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা এবং র‌্যাব-১ ও র‌্যাব-৪ এর যৌথ অভিযানে গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মামলার প্রধান আসামি আশরাফুল আহসান জিতুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

নিহত শিক্ষক উৎপল কুমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ২০১৩ সালে আশুলিয়ার হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি কলেজটির শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের স্কুল ইউনিফর্ম, চুলকাটা, ধূমপান করা ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত বিষয়ে ব্যবস্থা নিতেন তিনি । এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খেলাধুলা পরিচালনাসহ শিক্ষার্থীদের সুপরামর্শ, মোটিভেশন ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সৃজনশীলতা বিকাশে ভূমিকা রাখতেন ওই শিক্ষক।

হত্যাকারী জিতু ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির ছাত্র। শিক্ষাজীবনে বিরতি দিয়ে প্রথমে স্কুল, পরে মাদ্রাসা এবং সর্বশেষ আবারও স্কুলে ভর্তি হয় সে। স্কুলে সবার কাছে একজন উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময় শৃঙ্খলাভঙ্গ, মারামারিসহ স্কুলের পরিবেশ নষ্টের জন্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। ছাত্রীদের ইভটিজিং ও বিরক্ত করা, স্কুল প্রাঙ্গণে ধূমপান, ইউনিফর্ম ব্যতিত স্কুলে আসা-যাওয়া, মোটরসাইকেল নিয়ে বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করা ছিল তার জন্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।

জিতু তার নেতৃত্বে এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলে। গ্যাং সদস্যদের নিয়ে মাইক্রোবাসে করে যত্রতত্র আধিপত্য বিস্তার করত। এসব ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করলে গ্যাং সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তার ওপর চড়াও হতো। বিভিন্ন সময় এলাকায় ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে হামলা ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে শোডাউন দিত।

হত্যার কারণ সম্পর্কে জিতু জানিয়েছে, ঘটনার কয়েকদিন পূর্বে ওই স্কুলের এক ছাত্রীর সাথে জিতুকে ঘোরাফেরা করতে দেখে শিক্ষক উৎপল কুমার তাকে কিছু কথা বুঝিয়েছেন। এই ঘটনায় সে শিক্ষকের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে হামলার পরিকল্পনা করে।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ জুন ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে অতর্কিতভাবে শিক্ষক উৎপল কুমারকে বেধড়ক আঘাত করে পালিয়ে যায় সে। র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, ঘটনার পর জিতু এলাকায় সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করলেও পরবর্তীতে সে এলাকা ত্যাগ করে।

প্রথমে বাসযোগে মানিকগঞ্জে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাত্রীযাপন করে। পরদিন অবস্থান পরিবর্তন করে আরিচা ফেরীঘাটে পৌঁছায় এবং ট্রলারযোগে নদী পার হয়ে পাবনার আতাইকুলাতে তার এক পরিচিতের বাড়িতে আত্মগোপণ করে।

পরদিন ভোরে সে আবারও তার অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য আতাইকুলা হতে বাসযোগে কাজিরহাট লঞ্চ টার্মিনালে এসে লঞ্চযোগে আরিচাঘাট পৌঁছায়। সেখান থেকে বাসযোগে গাজীপুরের শ্রীপুরে ধনুয়া গ্রামে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তার করেছে।