২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। একদিকে এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও আয়ের নতুন উৎস তৈরি করেছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। উৎপাদন, লজিস্টিকস, অর্থ এবং সেবা খাতে এআইয়ের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে পরিচালন ব্যয় কমার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা বেড়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতীকী ছবি

স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং এআই-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কোম্পানিগুলোর হাজার হাজার কোটি ডলার সাশ্রয় করেছে। এর ফলে এআই-ভিত্তিক পণ্য, সফটওয়্যার এবং পরামর্শ সেবার একটি সম্পূর্ণ নতুন বৈশ্বিক বাজার তৈরি হয়েছে। এআই ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি এবং অ্যালগরিদম অডিটিংয়ের মতো খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও গতানুগতিক বা রুটিন কাজের ক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, যা শ্রমবাজারকে বদলে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এ বছর এআই বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং জাতীয় এআই কৌশলগুলো এই প্রতিযোগিতায় মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। তবে এআই অবকাঠামোর দ্রুত প্রসারের ফলে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বেড়েছে, যা প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ ও পানি খরচ করছে এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে এআইয়ের অবদান:

পরামর্শক ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি-এর ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারে। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বার্ষিক গড়ে অতিরিক্ত ১ শতাংশ অবদান রাখবে, যার প্রভাব ১৯ শতকের শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তুলনীয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই-চালিত বিশ্ব অর্থনীতির পুনর্গঠন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। পিডব্লিউসি-এর মতে, ২২টি বৈশ্বিক খাতের মধ্যে ১৭টিই এখন নিজেদের নতুন করে সাজানোর চাপে রয়েছে। আগামী দশকে এআই প্রথাগত খাতের সীমানা ছাড়িয়ে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), ব্যাটারি এবং সফটওয়্যার খাত অর্থনৈতিক মূল্য পুনর্বণ্টনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে এআইয়ের দ্রুত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও জলবায়ু সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে। পিডব্লিউসি জানিয়েছে, জলবায়ু ঝুঁকির কারণে ২০৩৫ সালে বিশ্ব অর্থনীতি তার সম্ভাবনার চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ পিছিয়ে পড়তে পারে।

২০৩০ সালের মধ্যে ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্তির শঙ্কা:

এআই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখলেও এটি অনেক পেশার মানুষের জন্য বেকারত্বের ঝুঁকি তৈরি করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত ‘ফিউচার অব জবস ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই-চালিত অটোমেশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ডেটা বিশ্লেষণ, এআই উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হলেও রুটিন ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রশাসনিক সহায়তা, গ্রাহক সেবা, অ্যাকাউন্টিং এবং কিছু অফিস পরিষেবার কাজগুলো এআই দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার হুমকির মুখে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও (আইএলও) একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, এআই-চালিত দক্ষতার ফলে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক সুবিধা শ্রমবাজারে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

এআই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি পদক্ষেপ:

এআই প্রযুক্তির ঝুঁকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাক্ট’ ২০২৪ সালের ১ আগস্ট কার্যকর হলেও, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্মতি ছাড়া এআই ব্যবহার করে মুখমণ্ডল ও আবেগ শণাক্তকরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র গত ১৯ মে ‘টেইক ইট ডাউন অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন পাস করেছে। এর লক্ষ্য হলো সম্মতি ছাড়া তৈরি করা ‘ডিপফেক’ ছবি ও ভিডিও, বিশেষ করে প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফির মতো বিষয়গুলো মোকাবিলা করা। এছাড়া তথ্য চুরির অভিযোগে চীনা চ্যাটবট ‘ডিপসিক’ নিষিদ্ধ হওয়া এবং সার্চ ইঞ্জিনে চ্যাটজিপিটির কথোপকথন ফাঁস হওয়ার মতো ঘটনাগুলো এআই টুলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ডেটা সেন্টার ও পরিবেশগত প্রভাব:

ক্লাউড পরিষেবা এবং এআই অ্যাপ্লিকেশন চালানোর জন্য ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলো প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ ও পানি খরচ করে, যা পরিবেশ ও জনবসতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে ৪,০০০-এর বেশি ডেটা সেন্টার রয়েছে। গত বছর দেশটির মোট বিদ্যুৎ খরচের ৪ শতাংশই ছিল এই ডেটা সেন্টারগুলোর দখলে। আগামী ছয় বছরে বিদ্যুতের চাহিদা ১৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একটি সাধারণ হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার বছরে এক লাখ পরিবারের সমান বিদ্যুৎ খরচ করে। ভবিষ্যতে নির্মিতব্য ডেটা সেন্টারগুলো এর চেয়ে ২০ গুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিদ্যুতের পাশাপাশি সিস্টেম ঠান্ডা রাখতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। গুগলের ২০২৪ সালের পরিবেশগত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর প্রতিষ্ঠানটির ডেটা সেন্টারগুলো ২,২৭০ কোটি লিটার পানি খরচ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ভার্জিনিয়া এবং মিনেসোটার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডেটা সেন্টারের আশেপাশের বাসিন্দারা পানির গুণমান নষ্ট হওয়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল বৃদ্ধি এবং শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছেন।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব:

পেশাদার মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সিলরের পরিবর্তে চ্যাটবট ব্যবহার মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান-সেন্টার্ড এআই (এইচএআই)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটবটগুলো নির্দিষ্ট মানসিক ব্যাধির ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক আচরণ করে এবং কখনো কখনো ব্যবহারকারীদের এমন আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে যা তাদের বা অন্যদের জন্য ক্ষতিকর।

আনাদোলু এজেন্সি অবলম্বনে

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.