আসন্ন এয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার কথা বলছে। দুই দলেরই বক্তব্যে ঘুরেফিরে আসছে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, তরুণদের ক্ষমতায়ন, শিল্পায়ন ও কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা।

তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমান

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রস্তাবই তাদের আসন্ন নির্বাচনী ইশতেহারের মূল ভিত্তি হবে। জামায়াত ইতোমধ্যে ঢাকায় একটি পলিসি সামিট আয়োজন করে কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিশন তুলে ধরেছে। বিএনপিও বিভিন্ন জনসভা ও নীতিগত বক্তব্যে কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তাকে সামনে আনছে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য?

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একাধিক কাঠামোগত চাপে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪-৫ শতাংশের ঘরে, যা করোনা-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে ৯-১০ শতাংশের আশপাশে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং ভোগক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে।

অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির প্রায় ২৩-২৪ শতাংশে আটকে আছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই হার নতুন শিল্প স্থাপন ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়। কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৭ শতাংশের নিচে থাকায় সরকারের রাজস্ব সক্ষমতাও সীমিত।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ, জ্বালানি ঘাটতি এবং দুর্বল লজিস্টিকস ব্যবস্থা- যা বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ১৮ মাসে এক কোটি চাকরি সৃষ্টি এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা চালুর কথা বলছে। জামায়াতের দাবি, পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্তত ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।

কিন্তু অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অর্থনীতিকে টেকসইভাবে ৮-১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পথে নিতে হবে। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১৮-২০ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। সে হিসেবে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও রপ্তানি-তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের গতি প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, কর্মসংস্থান নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আকর্ষণীয় হলেও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া এগুলো বাস্তবায়ন কঠিন।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সরাসরি অনুপাত নির্ধারণ করা সহজ নয়।

তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগের বিপরীতে বছরে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ১২-১৩ লাখ।

জামায়াত করপোরেট কর ১৯ শতাংশে এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপি নির্দিষ্ট হার না বললেও ব্যবসাবান্ধব সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কথা বলছে।

ব্যবসায়ী মহল বলছে, কর কমলে বিনিয়োগে উৎসাহ আসতে পারে। তবে বিকল্প রাজস্ব উৎস ছাড়া কর হ্রাস করলে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়বে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, কর কমানোর পাশাপাশি সুদহার, ডলার সংকট, নীতিগত স্থিতিশীলতা-সবকিছু একসঙ্গে সমাধান করতে হবে।

সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, রাজস্ব বাড়াতে কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন ব্যবস্থা এবং কর ফেরতের কার্যকর প্রক্রিয়া চালু করা জরুরি।

বিএনপি বেকার ভাতা, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা বলছে। জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে সুদমুক্ত ঋণ ও সরাসরি নগদ সহায়তার।

বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। অথচ শুধু বিএনপির প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গেলে বছরে প্রায় ১.২ লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব বাড়ানো ও ভর্তুকি ব্যবস্থায় সংস্কার ছাড়া এই ধরনের কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

দুই দলই শিল্পায়ন ও কৃষিতে জোর দিচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো- গ্যাস ঘাটতি, বিদ্যুতের উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিপুল ভর্তুকি চাপ। গত পাঁচ বছরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সংস্কার ছাড়া শুধু দাম স্থির রাখার প্রতিশ্রুতি বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

কৃষি খাতেও ভর্তুকি বাড়ছে। যদিও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকি কমানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

আইসিটি ও ফ্রিল্যান্সিংকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে দেখছে দুই দলই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডেটা সিকিউরিটি, দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না করলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন।

বিডিজবসের সিইও ফাহিম মাশরুরের মতে, এই খাতে সম্ভাবনা আছে, তবে নীতিগত সংস্কার ও প্রশিক্ষণ ছাড়া বড় সাফল্য আসবে না।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.