আপনি পড়ছেন

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকার চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গত এক মাস ধরে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের বাজারে দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার জেরে কৃষিপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি
ছবি - সংগৃহীত

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে তেহরানের পাল্টা পদক্ষেপের পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। চলমান এই সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর চাপ আরও বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের চারপাশে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জ্বালানি, সার ও পরিবহন খরচ বেড়েছে, যা বিশ্বব্যাপী কৃষিবাজারে দাম বৃদ্ধির নতুন ঢেউ তৈরি করেছে। এসব ঘটনার কারণে উৎপাদকরা তাদের ফসল রোপণের পছন্দ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি পুরো কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সারের উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকরা ভুট্টা ও গমের পরিবর্তে সয়াবিনের মতো কম সার প্রয়োজন হয় এমন ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভুট্টার চাষ কমবে এবং সয়াবিনের চাষ বাড়বে।

কৃষিপণ্যের দামের গতিবিধি পরিমাপকারী ‘এসঅ্যান্ডপি জিএসসিআই এগ্রিকালচার’ (এসপিজিএসএজি) সূচক সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এই সূচক ৩৪৫ দশমিক ৪৭ থাকলেও ২৭ মার্চ তা বেড়ে ৩৬৮ দশমিক ৮৩-তে পৌঁছায়।

একই সময়ে প্রতি বুশেল গমের দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ, ভুট্টার ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং চালের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, তবে সয়াবিনের দাম কমেছে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া প্রতি পাউন্ড চিনির দাম ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ, তুলার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কফির দাম ৬ শতাংশ বাড়লেও প্রতি টন কোকোর দাম কমেছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ।

ইস্তাম্বুলভিত্তিক বাহচেশেহির ইউনিভার্সিটির সামষ্টিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ রাহামি ইনজেকারা আনাদোলুকে জানান, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জ্বালানি ও সারের বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন ও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি জানান, বিশ্বের প্রায় ৩৯ শতাংশ সার এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয় এবং কাতার, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও বাহরাইন বিশ্বের মোট ইউরিয়া রপ্তানির প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করে।

তিনি বলেন, ‘এই পথ দিয়ে প্রায় ২০ শতাংশ ডায়ামোনিয়াম ফসফেট, ১০ শতাংশ মনোঅ্যামোনিয়াম ফসফেট, ২৫ শতাংশ অ্যামোনিয়া এবং ৩০ শতাংশ সালফার পরিবহন করা হয়, তাই প্রণালীটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।’

ইনজেকারা আরও জানান, সার, ইউরিয়া এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার কারণে এমন একটি খাদ্য সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের চেয়েও গভীর।

তিনি জোর দিয়ে জানান, প্রণালী দিয়ে চালান বন্ধ হওয়ার কারণে বিশ্বের ৩৮ শতাংশ নাইট্রেট-ভিত্তিক এবং ২০ শতাংশ ফসফেট-ভিত্তিক সার সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তিনি জানান, উত্তর গোলার্ধে রোপণ মৌসুম শুরু হওয়ার কারণে জাহাজ চলাচলে যেকোনো বাধা সরাসরি কৃষি উৎপাদনশীলতা ও খাদ্য সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলবে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো, যারা তাদের ৬০ শতাংশের বেশি ইউরিয়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংগ্রহ করে, তাদের বর্তমান মজুত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে।

তুরস্কের সেলজুক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেকি বায়রামোগলু আনাদোলুকে জানান, গত এক মাসের যুদ্ধের প্রভাব এখনো বৈশ্বিক খাদ্য সূচকে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি খাদ্যের দাম বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারি না, বরং এটি খাদ্যের দামে দ্বিতীয় দফার ধাক্কার ভিত্তি তৈরি করছে।’

তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের প্রথম মাসে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সারের বাজারে। তিনি আরও বলেন, ‘যদি বিকল্প কোনো বাণিজ্য পথ খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে আমরা শুধু জ্বালানির উচ্চমূল্যের সঙ্গেই লড়ব না, বরং সার, পশুখাদ্য, শস্য, ভোজ্যতেল এবং প্রাণিজ আমিষের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়বে।’

আঙ্কারা ইলদিরিম বেয়াজিত ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহকারী অধ্যাপক কেনান আসলানলি আনাদোলুকে জানান, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে পারস্য উপসাগর থেকে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম, এলএনজি, সার ও ধাতুর সরবরাহ থমকে গেছে।

আসলানলি জানান, উপসাগরীয় দেশগুলো নাইট্রেট-ভিত্তিক সার, সালফার, অ্যালুমিনিয়াম, হিলিয়াম ও ব্রোমিনের মতো পণ্যের প্রধান উৎপাদক এবং যুদ্ধপূর্ব অবস্থার তুলনায় সারের দাম বৃদ্ধি ফসলের ফলন ও বৈশ্বিক খাদ্যের দামকে প্রভাবিত করবে।

তিনি বলেন, ‘তেল খাতের মতো সার খাতেও বিশ্বব্যাপী সমন্বিত কৌশলগত মজুত না থাকায় এই সরবরাহ বিঘ্নের পরিস্থিতি সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।’

আঙ্কারাভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (ওআরএসএএম) উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকা অধ্যয়ন সমন্বয়ক কান দেভেচিওগ্লু আনাদোলুকে জানান, প্রণালীতে হামলার ঝুঁকি ও বাস্তব হুমকির কারণে ট্যাংকারের বিমা প্রিমিয়াম এবং মালবাহী খরচ বেড়ে গেছে। এটি কেবল তেল ও এলএনজি চালান নয়, কনটেইনার বাণিজ্যেও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, ‘সার ও জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি খাদ্যের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে আমদানি-নির্ভর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষিবাজারে বিশেষ করে শস্য ও সারের দাম বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হলেও ব্যাপক সরবরাহ সংকট এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। তবে সংঘাত চলতে থাকলে এর প্রভাব বহুগুণ ধ্বংসাত্মক হতে পারে।’

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.