বিশ্বের সর্বশেষ বিচ্ছিন্ন উপজাতিদের সংস্পর্শে পেরুর আমাজন গ্রামের বাসিন্দারা
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পেরুর আমাজন জঙ্গলের গহিনে থাকা বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন উপজাতি মাশকো পিরোর সঙ্গে যোগাযোগ সামলাতে কাজ করছেন আদিবাসী সুরক্ষা কর্মীরা। এক দশকের বেশি সময় ধরে এই উপজাতির উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ কাঠপাচার ও খনিজ উত্তোলনের কারণে তারা গভীর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কখনো কখনো নদীর প্রত্যন্ত তীরে কেবল পায়ের ছাপ দেখে তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। আবার কখনো তাদের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশের কারণে গভীর জঙ্গল থেকে সহিংসতার খবর আসে। মাঝেমধ্যে গ্রামবাসীদের ধারণ করা ভিডিওতে জঙ্গলের প্রান্তে ডজনখানেক মানুষের উপস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া উত্তেজনার দৃশ্যও দেখা যায়। তবে কার্লোস ট্রিগোসোর কাছে পেরুর আদিবাসী গ্রাম দিয়ামান্তের কাছে বিচ্ছিন্ন মাশকো পিরো উপজাতির এই উপস্থিতি এখন একটি নিয়মিত মৌসুমী ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
৬৬ বছর বয়সী ট্রিগোসো আনাদোলুকে জানান, তারা তাদের গ্রামের খুব কাছাকাছি চলে আসে যা তাদের সম্প্রদায়ের জন্য একটি ঝুঁকি। সুরক্ষা কর্মী হিসেবে তারা নৌকায় করে নদীর উজানে টহল দেন এবং যখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়, তখন তাদের সম্প্রদায়ের কাছাকাছি না আসার নির্দেশ দেন।
আদিবাসী ইনে উপজাতির সদস্য ট্রিগোসোর সঙ্গে মাশকো পিরোদের জাতিগত ও ভাষাগত মিল রয়েছে। পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করা এই সুরক্ষা কর্মীর দায়িত্ব হলো তাদের উপস্থিতির লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং তারা কাছাকাছি এলে হস্তক্ষেপ করা। সাধারণত আমাজনের শুষ্ক মৌসুমে এই বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলো কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করতে বড় নদীর তীরে চলে আসে।
সুরক্ষা কর্মীরা প্রত্যন্ত নজরদারি চৌকি থেকে কাজ করেন। নদী ও জঙ্গলের করিডোরগুলোতে টহল দেওয়ার মাধ্যমে তারা কাছাকাছি থাকা সম্প্রদায়গুলোকে রক্ষা করার পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন উপজাতিদের সুস্থতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। এর মাধ্যমে তারা অবাঞ্ছিত যোগাযোগ ও ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ রোধ করেন।
ট্রিগোসো বলেন, ‘এটি একটি বিপজ্জনক কাজ। আমরা যেকোনো মূল্যে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করি। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলি এবং বোঝানোর চেষ্টা করি যে আমরা একই সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা সেটি বুঝতেও পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে যখন উত্তেজনা দেখা দেয়, তখন এটি বিপজ্জনক হতে পারে। তাদের মানসিকতা আমাদের মতো নয়। আমরা তাদের সতর্ক করে দিই যে তারা আমাদের গ্রামবাসীদের হত্যা করতে পারবে না।’
তবে এই ভঙ্গুর সহাবস্থান বজায় রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। বৈধ ও অবৈধ কাঠুরিয়া, খনি শ্রমিক এবং অন্যান্যরা আমাজনের আরও গভীরে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বনজ সম্পদের প্রাপ্যতা প্রভাবিত হওয়ায় বিশ্বের সর্বশেষ বিচ্ছিন্ন উপজাতিগুলোর মধ্যে কয়েকটি তাদের গভীর আস্তানা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
যোগাযোগ বৃদ্ধির পেছনের কারণগুলো অস্পষ্ট হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা সহিংস সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দিয়ামান্তে গ্রামে এক দশকের বেশি সময় ধরে মাশকো পিরোদের বারবার আগমনের ফলে এরই মধ্যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালে ট্রিগোসোর শ্বশুর মাশকো পিরোদের ছোড়া তীরে নিহত হন। গ্রামবাসীদের ধারণা, খাদ্য ও সরঞ্জামের বিনিময়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি ভঙ্গুর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছিল, যদিও এর সঠিক কারণ আজও অজানা।
ব্রাজিলের পর পেরুতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিচ্ছিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাস করছে বা নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করেছে, যারা ২৫টির বেশি জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। আদিবাসী অধিকার গোষ্ঠী সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনালের মতে, পেরুতে অন্তত ২০টি বিচ্ছিন্ন উপজাতি বাস করে বলে ধারণা করা হয়।
পেরু-ব্রাজিল সীমান্ত বরাবর এক বিশাল ভূখণ্ডে বসবাসকারী মাশকো পিরোদের পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় বিচ্ছিন্ন উপজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের দৃশ্যমানতা বাড়লেও তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে, যা বিভিন্ন ভুল ধারণা ও বিকৃত গল্পের জন্ম দিচ্ছে।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে পেরুর আমাজনে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কাজ করা চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী গ্লেন শেপার্ড বলেন, ‘একটি ভুল ধারণা হলো, এই মানুষগুলো বিচ্ছিন্ন শিকারি-সংগ্রাহক যারা এখনো প্লাইস্টোসিন যুগের মতো জীবনযাপন করছে। অনেকেই ভাবেন তারা হাজার হাজার বছর ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, আমার জানা মতে এই মানুষগুলো নিজেদের বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে খুব সম্প্রতি বিচ্ছিন্নতাকে বেছে নিয়েছে।’
শেপার্ড জানান, উনিশ ও বিশ শতকের রাবার শিল্পের উত্থানের সময় অনেক গোষ্ঠী প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে যায়। সে সময় ব্যাপক সহিংসতা, দাসত্ব ও রোগের প্রাদুর্ভাব আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘গণহত্যা ও দুর্ব্যবহারের কারণে তারা বহিরাগতদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। সম্ভবত তারা আমাদের সম্পর্কে আমাদের চেয়ে বেশি জানে। কারণ তাদের বেঁচে থাকার কৌশল নির্ভর করে আমরা কোথায় আছি এবং কী করছি তা জানার ওপর, যাতে তারা দূরে থাকতে পারে।’ শেপার্ড আরও বলেন, ‘মাশকো পিরোদের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল, কারণ তাদের কেবল ভূমি থেকেই উচ্ছেদ করা হয়নি, তারা তাদের কৃষি, নৌকা ও মাছ ধরার উপায়ও হারিয়েছিল।’
এই গোষ্ঠীগুলোকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়ার কারণগুলো এখনো শেষ হয়ে যায়নি, বরং আরও তীব্র হয়েছে। তেল অনুসন্ধান, কাঠ কাটা, খনিজ উত্তোলন, মাদক চোরাচালান এবং জমি দখলের পাশাপাশি রাস্তার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কারণে এই সম্প্রদায়গুলোর প্রত্যন্ত আশ্রয়স্থলগুলো ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। পেরু আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন উপজাতিদের আঞ্চলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিলেও, জনস্বার্থের প্রয়োজনে সংরক্ষিত এলাকায় সম্পদ উত্তোলনের অনুমতি দিয়ে থাকে।
বাস্তবে এটি ভূমির ব্যবহারের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছে। বৈধ কাঠ কাটার অনুমোদন প্রায়ই বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত অঞ্চলগুলোর সঙ্গে মিলে যায়, যা সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ায়। এর জেরে সহিংসতাও ঘটছে। ২০২৪ সালে মাশকো পিরোদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করার পর তাদের তীরে অন্তত দুজন কাঠুরিয়া নিহত হন। গবেষকরা বলছেন, বহিরাগতদের দ্বারা বিচ্ছিন্ন মানুষের হত্যার চেয়ে এই ধরনের ঘটনাগুলো বেশি প্রকাশ্যে আসে, কারণ বিচ্ছিন্ন আদিবাসীদের মৃত্যুর খবর প্রায়ই নথিবদ্ধ হয় না।
পেরুর কুসকো এবং মাদ্রে দে দিওস অঞ্চলের উপজাতিদের প্রতিনিধিত্বকারী আঞ্চলিক আদিবাসী ফেডারেশন (ফেনামাদ) পেরু সরকারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। তাদের দাবি, সরকার বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায়গুলোকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এর জবাবে কর্তৃপক্ষ ও আদিবাসী সংগঠনগুলো মাদ্রে দে দিওস এবং এর প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতে নজরদারি চৌকির একটি ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। এই পদক্ষেপের একটি মূল অংশ হলো নদীর তীরের নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে কলা, কাসাভা ও ভুট্টার মতো খাবার রেখে আসা। মাশকো পিরোরা জঙ্গলে ফিরে যাওয়ার আগে সেগুলো সংগ্রহ করে। এই চর্চা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তেজনা কমাতে এবং সরাসরি সংঘাত এড়াতে সাহায্য করেছে।
তবে এটি বিতর্কমুক্ত নয়। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, খাবার সরবরাহ করা তাদের নির্ভরশীল করে তুলতে পারে এবং ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলোকে বাইরের সমাজের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের দিকে টেনে আনতে পারে। তবে আপাতত এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য এটি অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সুরক্ষা কর্মীদের কাজ এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক। শেপার্ড বলেন, ‘সুরক্ষা কর্মীরাই বিচ্ছিন্ন মানুষদের এই নাজুক পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন। আপনাদের স্বীকার করতে হবে যে, মাঠে এবং এসব সংস্থায় যারা কাজ করছেন, তারা সত্যিই বীর।’
নদীর প্রত্যন্ত তীরে এক দশক ধরে কাজ করা ট্রিগোসোর কাছে বর্তমান পরিস্থিতি ক্রমশ আরও ভঙ্গুর মনে হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মাশকো পিরোরা স্বেচ্ছায় হোক বা বাধ্য হয়ে, একদিন জাতীয় সমাজের সঙ্গে যুক্ত হবে। এটি এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
ট্রিগোসো বলেন, ‘আপাতত আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলি, তাদের খাবার দিই এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে।’
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.