আপনি পড়ছেন

বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করে নিজস্ব পথ তৈরি করতে হবে। বেলজিয়ামের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য মার্ক বোটেঙ্গা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, ইউরোপের জনগণের করের টাকায় ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করা হচ্ছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) সরাসরি অপরাধের অংশীদার করছে।

বোটেঙ্গা: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে ইউরোপকে
মার্ক বোটেঙ্গা

মার্ক বোটেঙ্গা বলেন, ‘ইউরোপ যদি একটি নির্ভরযোগ্য শক্তি হতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের এই লেজুড়বৃত্তি থেকে সরে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম অনুগত থাকা এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি ছোট অংশীদার হয়ে থাকার প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটনের প্রতি ইইউর এই অনুগত অবস্থান জ্বালানির মূল্য থেকে শুরু করে গ্লোবাল সাউথে জোটটির অবস্থান পর্যন্ত ইউরোপীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বামপন্থী দলের এই সদস্য জানান, গাজায় জাতিগত নিধন ও গণহত্যার জন্য ইইউ ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার অন্যতম কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য। তিনি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনকে ইউরোপের নিরাপত্তার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘আনুগত্য’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। সম্প্রতি ফন ডার লিয়েন বলেছিলেন, ‘ইউরোপ আর পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার রক্ষক হতে পারে না।’ এই মন্তব্যের জেরে বোটেঙ্গা বলেন, ‘আমি মনে করি উরসুলা ফন ডার লিয়েনের এই ধরনের বক্তব্য বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। কারণ এগুলো জাতিসংঘভিত্তিক ব্যবস্থাকে ক্ষুণ্ন করে। তারা মূলত এই বার্তাই দিচ্ছে যে ইউরোপ আর আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না।’

আন্তর্জাতিক আইন পরিত্যাগ করলে বিশ্বজুড়ে লাগামহীন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এমন একটি বিশ্ব তৈরি হবে যেখানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানে যেভাবে বিজ্ঞানীদের হত্যা করছে, তা স্বাভাবিক বলে গণ্য হবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় যেভাবে প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করেছে, তা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিউবায় তেল প্রবেশ করতে না দিয়ে পুরো দেশকে শ্বাসরুদ্ধ করার মতো ঘটনা স্বাভাবিক হবে এবং ফিলিস্তিনের মতো জায়গায় গণহত্যা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’

ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নেসেটের অনুমোদনের বিষয়ে তিনি জানান, ইইউ এই ইস্যুতেও নীরব থেকেছে। তিনি বলেন, ‘ইইউ বলছে, এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের একটি অংশীদারত্ব চুক্তি রয়েছে, যেখানে বলা আছে ইসরায়েলকে মানবাধিকার সম্মান করতে হবে। আমরা কেন সেই চুক্তি স্থগিত করছি মাস?’ ফিলিস্তিনি বন্দি বিষয়ক কমিশনের তথ্যমতে, ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ১১৭ জন ফিলিস্তিনির ওপর এই আইন প্রয়োগ হতে পারে। জোটটি মৃত্যুদণ্ড আইনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ইসরায়েলকে তার আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বোটেঙ্গা এই পদক্ষেপকে নিছক কথার কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি আপনার কথার ওপর ভিত্তি করে কাজ না করেন, তবে অন্য দেশগুলোর কাছে আপনার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না এবং তারা আপনাকে একটি স্বাধীন শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করবে না।’

ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তার সমালোচনা করে বোটেঙ্গা জানান, তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলোতে মূলত ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের কর্মকাণ্ড এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা কেবল তেহরানকে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে হামলা বন্ধ করতে বলেছে। বোটেঙ্গা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশ্বাসযোগ্য হতে চাইলে সবার আগে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আর এখানকার বাস্তবতা হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের অংশীদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাপক লঙ্ঘন করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা মূলত ভুলে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছে। তাই তারা ধারাবাহিকভাবে ইরানকে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।’

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল, জর্ডান, ইরাক এবং মার্কিন সামরিক স্থাপনা থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে হতাহত ও অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজার ও বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

বোটেঙ্গা অন্যান্য সংঘাত, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইইউর দ্বৈত নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় জোটটি ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অথচ ইসরায়েলের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিক্রিয়া বেশ সংযত। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইইউর এই নিষ্ক্রিয়তা কেবল তাদের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেও দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

লেবানন ‘দ্বিতীয় গাজা’ হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে বোটেঙ্গা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিবৃতিগুলোকে একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি ইসরায়েলিদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে তারা কী করছে তা দেখেন, তবে বুঝতে পারবেন তারা পুরো গ্রাম ধ্বংস করছে এবং জায়গা খালি করে দিচ্ছে। এটি জাতিগত নিধন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো যুদ্ধাপরাধ। এর পাশাপাশি দখলদারিত্ব, সংযুক্তি এবং সম্প্রসারণের একটি কৌশল রয়েছে, যা অন্য কোনো দেশ করলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিন্দা জানাত এবং ব্যবস্থা নিত।’

২০২৪ সালের নভেম্বরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও, ২ মার্চ হিজবুল্লাহর একটি আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালিয়েছে। লেবাননের কর্তৃপক্ষের মতে, তারপর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৭৫০ জন আহত হয়েছেন।

বোটেঙ্গা ইইউকে কেবল সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্যই অভিযুক্ত করেননি, বরং বিদ্যমান চুক্তিগুলোর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এই সহিংসতায় সহায়তা করার জন্যও দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে এটি থামাতে কিছুই করেনি, বিষয়টি শুধু এমন নয়। ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের একটি বিশেষ অংশীদারত্ব রয়েছে। এটি অত্যন্ত খারাপ একটি বিষয়। এর মানে হলো, ইউরোপের জনগণের করের টাকা ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাচ্ছে। এটি ইইউকে সরাসরি অপরাধের অংশীদার করছে।’

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.