আপনি পড়ছেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে দেশের ভেতরে ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছেন। হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন তার এই চাপ আরও বাড়িয়েছে। এছাড়া আগামী সপ্তাহে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য শীর্ষ সম্মেলন এবং উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা হোয়াইট হাউসের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

তেল, রাজনীতি ও চীন: কেন ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে চান ট্রাম্প?
ছবি -সংগৃহীত

সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে। তবে গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা এই কূটনৈতিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধ শেষ করতে ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

স্টিমসন সেন্টারের ‘রিইমাজিনিং ইউএস গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি প্রোগ্রাম’-এর গবেষণা বিশ্লেষক ইভান কুপার আনাদোলুকে বলেন, ‘ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে, তবে এক্ষেত্রে তাকে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে।’

তিনি জানান, হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের প্রভাব বা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বড় কোনো ছাড় দিয়ে ট্রাম্প দেশের ভেতরে দুর্বল হিসেবে প্রমাণিত হতে চান না।

কুপার আরও বলেন, ‘উপসাগরীয় অংশীদার দেশগুলো এবং ইসরায়েলের পরস্পরবিরোধী চাহিদার কারণে যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি টেকসই চুক্তির পথে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক জ্যাক ক্লেটন মনে করেন, ট্রাম্পের আলোচনার ধরন পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগকে আরও জটিল করেছে। তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু করে পরে গ্রহণযোগ্য শর্তে নেমে আসা যায়, তবে ট্রাম্পের একগুঁয়ে মনোভাব প্রথমত যুদ্ধ শুরু করতে ভূমিকা রেখেছে এবং উভয় পক্ষ কোনো আপস করতে না পারলে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

ক্লেটন জানান, সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়েছে এমনটা মনে না করিয়ে সম্মানজনক শর্তে যুদ্ধ শেষ করাই ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পকে এমন একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে যাতে মনে না হয় তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে পিছু হটেছেন। ক্লেটন উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে দুর্বল কোনো চুক্তি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হবে। কারণ, নির্বাচনী প্রচারণার সময় এবং ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বারবার ওই চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন।

অর্থনৈতিক প্রভাব এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। মার্কিন প্রশাসনের জন্য জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের ভেতরে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্লেটন বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টতই বুঝতে পারেনি যে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে, আর এটি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ইরানকে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে সাহায্য করেছে।’

তিনি আরও জানান, ট্রাম্প বাজার এবং জ্বালানির দাম নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক, আর এ কারণেই তিনি বাজার শান্ত করার জন্য বিভিন্ন বিবৃতি দিচ্ছেন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে, যা উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করা মার্কিন গ্রাহকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ক্লেটন জানান, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির রাজনৈতিক পরিণতি সম্পর্কে ট্রাম্প বেশ সচেতন। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে জীবনযাত্রার ব্যয় একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল, যা ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

কুপার বলেন, ‘এই যুদ্ধ কখনোই জনপ্রিয় ছিল না, তবে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান খরচ আমেরিকানদের কাছে সংঘাতের পরিণতি আরও স্পষ্ট করে তুলছে।’

এমনকি টাকার কার্লসন ও মেগিন কেলির মতো প্রভাবশালী রক্ষণশীল নেতারাও ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি ব্যয়বহুল বিদেশি যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন।

গত এপ্রিলের শেষের দিকে প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি-ইপসস-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ একটি বড় ভুল ছিল। অন্যদিকে ৪৪ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে তারা গাড়ি চালানো কমিয়ে দিয়েছেন। জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষের হার ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা তার দুই মেয়াদের রাষ্ট্রপতিত্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে রিপাবলিকানরাও ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। ক্লেটন বলেন, ‘ট্রাম্প যদি যুদ্ধ কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া শুরুও করেন, তবে তা হয়তো রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনাকে খুব একটা সাহায্য করবে না, কারণ অর্থনৈতিক উন্নতি হতে সময় লাগে।’

তবে কুপারের মতে, ট্রাম্প রিপাবলিকানদের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাবের চেয়ে নিজের শক্তি প্রদর্শনের দিকেই বেশি মনোযোগী। তিনি জানান, রিপাবলিকানরা যেকোনো মূল্যে তাকে সমর্থন করবে বলে ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। তবে কংগ্রেসের কিছু দুর্বল আসনে এই যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক রিপাবলিকান নেতা এখন কিউবার দিকে নজর ঘোরানোর দাবি করছেন, যা কম ব্যয়বহুল হতে পারে।

আগামী সপ্তাহে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত শীর্ষ সম্মেলনের আগে আন্তর্জাতিক চাপেরও সম্মুখীন হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চলাকালে হোয়াইট হাউস বেইজিংয়ের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় বসা এড়িয়ে যেতে চাইবে।

কুপার বলেন, ‘ট্রাম্প চাইবেন এই শীর্ষ সম্মেলন যেন পুরোপুরি বাণিজ্য এবং বাণিজ্য যুদ্ধ কমানোসহ মার্কিন অর্থনীতি জোরদার করার উপায় খোঁজার দিকে নিবদ্ধ থাকে।’

তিনি জানান, এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে শি জিনপিং ট্রাম্পকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপ দিয়ে নিজেকে একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেতে পারেন।

ক্লেটনের মতে, চীন এই সংকটকে ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করতে পারে। তিনি জানান, চীনের বৃহত্তর বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত অবকাঠামো ও বাণিজ্য পথ সম্প্রসারণে বেইজিংয়ের আগ্রহ বাড়ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপ ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশকে আরও জটিল করে তুলছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারায় নিযুক্ত একটি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা এই সপ্তাহে হঠাৎ করে স্থগিত করেন।

কুপার জানান, সৌদি আরবের এই অবস্থান সংঘাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে তৈরি হওয়া হতাশারই প্রতিফলন।

অন্যদিকে, কুপারের মতে, ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত চায় ওয়াশিংটন যেন ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখে। পাশাপাশি, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের ড্রোন হামলা আঞ্চলিক সরকারগুলোকে চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়তে বাধ্য করতে পারে বলে জানান ক্লেটন।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.