ঈদে মানুষ বাড়ি যাবে: তাদের নিরাপদ যাওয়া-আসা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে
- Details
- by হামীম কেফায়েত
প্রতিবছর ঈদ আসে। প্রতিবছর একই ঘোষণা আসে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলবে না, অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া যাবে না, চালক বিশ্রাম নেবেন, হাইওয়ে পুলিশ সজাগ থাকবে। মালিক সমিতির নেতারা মাইকের সামনে প্রতিশ্রুতি দেন। সরকারের পক্ষ থেকে সভা হয়, নির্দেশনা জারি হয়। পত্রিকায় ছাপা হয় নিরাপদ ঈদযাত্রার আহ্বান। তারপর ঈদের পনেরো দিন পার হলে হিসাব মেলানো হয়। সেই হিসাবে থাকে শুধু লাশের সংখ্যা।

পরিসংখ্যানের নেপথ্যে কান্না এ বছরের ঈদুল ফিতরে পনেরো দিনে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে ৩৯৪ জন মানুষ মারা গেছেন। শুধু সড়কেই নিহত হয়েছেন ৩৫১ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৬ জন। গত বছরের ঈদুল ফিতরের তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় নয় শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে সাড়ে আট শতাংশ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এই পরিসংখ্যান কোনো বিমূর্ত সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি মা, একটি সন্তান, একটি জীবনের হঠাৎ থেমে যাওয়া। কোরবানির ঈদ আসছে কিছুদিন পরেই। তার আগে প্রশ্নটি করা দরকার: এ পুনরাবৃত্তি কেন থামছে না?
মহাসড়কের বর্তমান চিত্র বাংলাদেশে সারা বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান গড়ে সাড়ে আট হাজারের বেশি মানুষ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী ৬ হাজার ৩৫৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮ হাজার ৫৪৩ জন। আগের বছরের তুলনায় মৃত্যু বেড়েছে সাড়ে সাত শতাংশ। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি থামানোর কোনো লক্ষণ নেই। ঈদ এলে এই সংখ্যা কয়েক গুণ হয়ে যায়, কারণ ঈদই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গণপরিবহন পরীক্ষার মুহূর্ত। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব বলছে, এবারের ঈদুল ফিতরে শুধু রাজধানী ঢাকা থেকেই ঘরমুখী হয়েছেন অন্তত এক কোটি পনেরো লাখ মানুষ। সারাদেশে যাতায়াত করেছেন প্রায় চার কোটি। এই বিপুল মানুষকে মাত্র চার থেকে পাঁচ দিনে পরিবহন করার মতো মানসম্মত ও নিরাপদ গণপরিবহন দেশে নেই। সংস্থাটি সরাসরি বলেছে এই কথা। তাহলে যা নেই, তা না থাকলেও মানুষ বাড়ি যাবে, কারণ ঈদের টান থামানোর সাধ্য কারও নেই। সেই অনিবার্য যাত্রায় তারা উঠে পড়েন ফিটনেসবিহীন বাসে, খোলা ট্রাকে, পণ্যবাহী পিকআপে, ট্রেনের ছাদে। কারণ বিকল্প নেই, কারণ ভাড়া আকাশচুম্বী, কারণ টিকিট কালোবাজারে চলে গেছে।
সংকটের মূলে থাকা কারণসমূহ এই পরিস্থিতির মূলে আছে কয়েকটি পুরোনো ও অমীমাংসিত সমস্যা:
১. মোটরসাইকেলের ঝুঁকি: এবারের ঈদুল ফিতরে মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেক ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশ ছিলেন মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী। ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় ১৫ দিনে ১৯৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬৫ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০২৫-এর ঈদুল ফিতরেও ১৩৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫১ জন
প্রাণ হারিয়েছেন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণ অনেক—বেপরোয়া গতি, হেলমেট না পরা, ক্লান্তি ও রাতের অন্ধকার। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরাই এর প্রধান শিকার।
২. ফিটনেসবিহীন যানবাহন: প্রতি ঈদের আগে বিআরটিএ এবং পুলিশের মোবাইল কোর্ট অভিযান চালায়। কিন্তু বাস মালিক সমিতির চাপে প্রশাসন প্রায়ই পিছু হটে। ফলে ইঞ্জিন থেকে কালো ধোঁয়া বেরোনো, ব্রেক কাজ না করা বাসগুলো মহাসড়কে নামে এবং দুর্ঘটনার কারণ হয়।
৩. চালকের ক্লান্তি: ঈদ মৌসুমে বেশি উপার্জনের লোভে অনেক চালক টানা ২০ থেকে ২৫ ঘণ্টা গাড়ি চালান। একজন ক্লান্ত চালকের প্রতিক্রিয়া করার ক্ষমতা কমে যায়, যা দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। চালকের কর্মঘণ্টা নির্ধারণের আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই।
৪. আইন ও বাস্তবতার ফাঁক: ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন আইন হলেও মালিক সমিতির ধর্মঘট ও আন্দোলনের হুমকির মুখে সরকার আইন সংশোধনের চাপে পড়েছে। ফলে চালকরা জানেন, নিয়ম ভাঙলে তাৎক্ষণিক কোনো কঠিন পরিণতি নেই।
৫. কাঠামোগত সমস্যা ও ভাড়ার নৈরাজ্য: ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। রেলপথ ও নৌপথের সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত ভাড়ার নৈরাজ্য। নির্ধারিত ভাড়ার কয়েকগুণ বেশি আদায় করায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ট্রাক বা ট্রেনের ছাদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প বেছে নেয়।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কোরবানির ঈদের আগে এখনও কিছু সময় আছে। এই সময়ে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব:
- মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ: মহাসড়কে রাতে মোটরসাইকেল চলাচল নিরুৎসাহিত করা এবং হেলমেট পরা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা।
- নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা: ঈদের আগের দিনের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো।
- জিপিএস ট্র্যাকিং: চালকের কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে জিপিএস ট্র্যাকিং কার্যকর করা।
- যাত্রী প্রতিনিধি: ঈদ ব্যবস্থাপনার সভায় যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: রেলপথের সম্প্রসারণ, নৌপথকে সক্ষম করা এবং বিআরটিসি বাসের সংখ্যা বাড়ানো।
উপসংহার: ঈদের আনন্দ প্রিয়জনের সঙ্গে থাকার আনন্দ। সেই আনন্দের পথটি যদি মৃত্যুর পথ হয়ে ওঠে, তাহলে ঈদ মানে কী? প্রতিবছর ঈদের পর যে পরিবারগুলো কারও লাশ নিয়ে ঘরে ফেরে, তাদের কাছে ‘নিরাপদ ঈদযাত্রা’ শব্দটি আর কোনো অর্থ বহন করে না। এই শব্দদুটিকে আবার অর্থবহ করতে হলে প্রতিশ্রুতির জায়গায় দরকার সদিচ্ছা, সভার জায়গায় দরকার কার্যক্রম, আর ঘোষণার জায়গায় দরকার জবাবদিহি। মানুষ বাড়ি যাবে। ঈদে মানুষ সবসময়ই বাড়ি যাবে। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি নিশ্চিত করবে যে তারা ফিরেও আসতে পারবে?
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, স্রোত ইমেইল: This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.