আপনি পড়ছেন

ভারতজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিষয় নিয়ে শোরগোল চলছে। বিষয়টি হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এর জন্ম। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ অনুসারী তৈরি হয়েছে।

যে কারণে আলোচনায় 'ককরোচ জনতা পার্টি'
ছবি- সংগৃহীত

একগুঁয়ে, যাকে নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব এবং মানুষ অপছন্দ করে এমন এক কীটকে সামনে রেখেই তৈরি হয়েছে এই ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম। এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম লাখ লাখ ফলোয়ার পেয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যমের দৃষ্টিও আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এর আবির্ভাব প্রবীণ রাজনীতিবিদদেরও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়। এটাকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গবিদ্রূপকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাতীয় অনলাইন আন্দোলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এর সদস্যপদের জন্য বেশ কয়েকটা শর্তও রয়েছে। শর্তগুলোও রসিকতায় ভরা। সদস্য হতে গেলে বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে সক্রিয় থাকাটা আবশ্যক। একইসঙ্গে পেশাগতভাবে র‍্যান্ট-এর ক্ষমতাও তাদের থাকতে হবে। র‍্যান্ট বলতে বোঝায় নানা বিষয় নিয়ে অভাব-অভিযোগ তুলে ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকা।

ককরোচ জনতা পার্টির নেপথ্যে বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট অভিজিৎ দীপকে। পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট হলো এমন এক বিশেষজ্ঞ যিনি কোনো রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল বা অধিকার রক্ষা করে এমন সংগঠনের হয়ে বার্তা তৈরি ও জনসংযোগের কাজ করেন।

দীপকে জানিয়েছেন, নেহাতই মজার ছলে বিষয়টা মাথায় এসেছিল তার। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে আম আদমি পার্টির সঙ্গে কাজ করতেন তিনি। ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই রাজনৈতিক সংগঠনের আবির্ভাব এক দশকেরও বেশি আগে। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল আম আদমি পার্টি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দলের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

বিবিসি মারাঠিকে অভিজিৎ দীপকে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমাদের সবার একত্রিত হওয়া উচিত, হয়তো একটা প্ল্যাটফর্ম শুরু করা যেতে পারে।’ এরপর যা ঘটে সেটা প্রত্যাশা করেননি তিনি।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপির গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার সদস্য যুক্ত হন। #ম্যায়ভিককরোচ (আমিও আরশোলা) এই 'হ্যাশট্যাগ' চালু হয়। এটি বহু বিরোধী নেতাদের সমর্থনও পেতে শুরু করে। গত বুধবার সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে পোস্ট করেন ‘বিজেপি বনাম সিজেপি’।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাইরেও 'সিজেপি' নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কিছুটা নাটকীয়ভাবে এবং প্রতীকী স্বরূপ আরশোলার বেশে হাজির হন।

গত বৃহস্পতিবার সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যায়। সদস্য সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিজেপির অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টকে টেক্কা দিয়েছে সিজেপি। ইনস্টাগ্রামে বিজেপির ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় ৮৭ লাখ।

বহুলভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং ভিন্ন মতাদর্শীদের কাছে সহজ নয়, এমন এক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সিজেপি অনেকটা তাজা বাতাসের মতো বলে মনে করছেন সমর্থকেরা। এই সমর্থকদের মধ্যে মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদের মতো বিরোধী রাজনীতিবিদ আছেন।

এতদিন ভারতের অনেক তরুণই বলতেন, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্রমাগত রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বিষয়ের সংস্পর্শে আসছেন ঠিকই, কিন্তু রাজনীতি এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে তাদের বিশেষ প্রতিনিধিত্ব নেই। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সিজেপি কোথাও তরুণদের প্রতিনিধিত্বের একটা প্রতীক হয়ে উঠতে শুরু করেছে। দীপকে বলেন, মানুষ হতাশ। কারণ তারা মনে করেন তাদের কথা শোনা হয় না বা তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ঢেউ দেখা গেছে, যা শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং বাংলাদেশে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। এই ক্ষোভের মূলে চাকরির সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধির মতো ইস্যু। ভারত এই জাতীয় পরিস্থিতি এখনো পর্যন্ত এড়িয়ে যেতে সক্ষম। তবে এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে যে চাপ অনুভূত হয়নি, তা নয়।

দ্রুত বর্ধনশীল এই অর্থনীতি একাধিক উদ্বেগের মুখোমুখি হয়েছে। এই তালিকায় আছে কর্মসংস্থান, বৈষম্য এবং ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির মতো ইস্যু। প্রাপ্তবয়স্ক হতে চলেছে এমন প্রজন্মের কাছে শিক্ষা এখন আর স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। অন্যদিকে, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও তাদের কাছে ক্রমশ ভঙ্গুর মনে হয়।

যদিও দীপকে এই বিষয়ে নেপাল বা শ্রীলঙ্কার অভ্যুত্থানের সঙ্গে ভারতের তুলনা করতে চাননি। তিনি বলেন, ভারতের পরিস্থিতি অন্যরকম। তার যুক্তিতে ভারতীয় তরুণদের মধ্যে হতাশা রয়েছে, কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম ভিন্ন। মূলত অনলাইনে তারা ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করেন এবং সেটাও একত্রে নয়।

দীপকের ভাষ্য, জেন-জি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বিষয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে এবং তারা এমন এক রাজনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করতে চায়, যার ভাষা নিজেরা বুঝতে পারে।

সিজেপির ওয়েবসাইট সেই চিন্তাধারাকেই প্রতিফলিত করে। সিজেপির ওয়েবসাইট পড়লে ইশতেহার বলে মনে হয় না, বরং ইন্টারনেটে যে ধরনের কথাবার্তা পড়তে আমরা অভ্যস্ত তারই প্রতিফলন। সিজেপি নিজেকে অলস এবং বেকারদের কণ্ঠস্বর হিসেবে বর্ণনা করে। পাশাপাশি এর নেপথ্যে কোনো স্পনসর নেই বলে দাবি করে। নিজেকে ‘একগুঁয়েদের ঝাঁক’ বলে আখ্যা দেয়। যারা সব ঠিক আছে ভান করতে ক্লান্ত তাদের পক্ষ থেকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।

গত সপ্তাহে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বিতর্কিত মন্তব্যের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে ককরোচ বা আরশোলা। এক মামলার শুনানি চলাকালীন সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ এক আইনজীবীর আচরণে অসন্তুষ্ট হন। ওই আইনজীবী অভিযোগ করেছিলেন, দিল্লি হাইকোর্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করতে বিলম্ব করছে। তার দাবি ছিল, এর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

সেই আবেদন খারিজ করে দিয়ে আদালতের ওই বেঞ্চ জানায়, 'সিনিয়র অ্যাডভোকেট'-এর পদমর্যাদা আদালতের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়, এটা কোনো মর্যাদার প্রতীক নয়। বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ বলে, সমাজে ইতোমধ্যে পরজীবী রয়েছে, যারা ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ করে। আপনিও কি তাদের দলে যোগ দিতে চান? এমন কিছু যুবক আছে যারা কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিজেদের পেশায় জায়গা করে নিতে না পারার কারণে তেলাপোকার মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

এই মন্তব্য অনলাইনে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন ক্ষোভ ও কৌতুক শুরু হয়, তেমনই এর হাত ধরে জন্ম নেয় 'ককরোচ জনতা পার্টি'। সিজেপির রয়েছে উপহাস করার প্রবণতা, ইচ্ছাকৃত রুক্ষ উপস্থাপনা এবং এমন ভাষা যেটাকে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যের চেয়ে বরং একটি অভ্যন্তরীণ রসিকতার মতো মনে হয়।

এই হাস্যরসের ভেতরে লুকিয়ে আছে চেনা সব রাজনৈতিক দাবি- জবাবদিহিতা, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। পাশাপাশি রয়েছে ক্রমাগত স্ক্রল করতে করতে নেচিবাচক কনটেন্ট দেখার প্রবণতা, বেকারত্ব এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক ক্লান্তি নিয়ে আত্ম-বিদ্রূপধর্মী রসিকতা। ব্যঙ্গ ও আন্তরিকতার মাঝামাঝি এই সুরই এর আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.