বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিপক্ষে জার্মানির ৪৬ শতাংশ তরুণ
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপের নিরাপত্তায় মার্কিন প্রতিশ্রুতির অনিশ্চয়তার মধ্যে জার্মানিতে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর বিতর্ক তীব্র হয়েছে। এই বিতর্ক দেশটির নাগরিকদের মধ্যে গভীর প্রজন্মগত বিভাজন তৈরি করেছে, যেখানে তরুণ সমাজ বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার তীব্র বিরোধিতা করছে।

২০১১ সালে দেশটিতে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা স্থগিত করা হয়েছিল। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং ইউরোপের নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে সংশয়ের কারণে বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো জোটের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে উত্তেজনা পুনরায় সামনে আসার পর এই সংশয় আরও বেড়েছে।
বার্লিন আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করেনি। তবে সম্প্রতি তারা একটি নতুন সামরিক সেবা মডেল গ্রহণ করেছে, যেখানে ১৮ বছর বয়সী তরুণদের জার্মানির সশস্ত্র বাহিনী ‘বুন্দেসভেয়ার’-এ কাজ করার ইচ্ছা ও যোগ্যতা নিয়ে একটি প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হবে। নারীরাও চাইলে স্বেচ্ছায় এতে অংশ নিতে পারবেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাফায়েল লস আনাদোলুকে জানান, ইউরোপের প্রতিরক্ষাকে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে ইউরোপীয়দের দ্বারা পরিচালিত ইউরোপীয় প্রতিরক্ষার জন্য তাদের আরও জনবল ও সক্ষমতা প্রয়োজন।
তবে জার্মানির তরুণ সমাজের বড় একটি অংশ বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে গভীরভাবে সন্দিহান। দেশটিতে সামরিকতাবাদ ও বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি এখনো জনমনে প্রভাব ফেলায় এই বিতর্ক বেশ সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বুন্দেসভেয়ার পুনর্গঠন এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে জনসমর্থন বাড়লেও, তরুণদের মধ্যে এই সমর্থন অনেক কম।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করার প্রশ্নে ইউরোপজুড়ে বয়সের ভিত্তিতে বড় ধরনের বিভাজন রয়েছে। জরিপের তথ্যানুযায়ী, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে, বয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে এই পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন অনেক বেশি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাফায়েল লস জানান, বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে সামরিক সেবায় ফেরার পক্ষে কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নেই। তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো কেবল বাধ্যতামূলক সেবার উদ্বেগই প্রকাশ করে না, বরং তরুণদের বৃহত্তর সমস্যাগুলোকে পুনরায় রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষাকেও তুলে ধরে।
২০২৬ সালের মার্চের শেষের দিকের হিসাব অনুযায়ী, বুন্দেসভেয়ারে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ নিয়মিত সেনা রয়েছেন। তবে জার্মানির সামরিক কৌশল অনুযায়ী, ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে মোট ৪ লাখ ৬০ হাজার সেনা প্রস্তুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ২ লাখ সেনা থাকবেন সংরক্ষিত বা রিজার্ভ ফোর্সে।
এই লক্ষ্য পূরণে ১৮ বছর বয়সীদের কাছে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ জানতে চেয়ে প্রশ্নপত্র পাঠানোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ১৮ বছর বয়সী তরুণদের বাধ্যতামূলক শারীরিক পরীক্ষাও শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
‘স্কুল স্ট্রাইক অ্যাগেইনস্ট কনস্ক্রিপশন’ আন্দোলনের মুখপাত্র ও তরুণ অধিকারকর্মী বেলা ব্রাইটনার জানান, বর্তমান আইনটি বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় পুরোপুরি ফিরে যাওয়া না হলেও, নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে এটি বৃহত্তর পরিসরে বাধ্যতামূলক সেবার পথ তৈরি করবে। সরকারের সামরিক সম্প্রসারণ পরিকল্পনা তরুণদের মধ্যে দেশটিকে আরও গভীর সামরিকীকরণের দিকে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে বলেও জানান তিনি।
রাফায়েল লস মনে করেন, জার্মানির সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সংকীর্ণ জাতীয় প্রকল্প হিসেবে না দেখে বৃহত্তর ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, ‘ইউরোপে জার্মানির ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আকার, সক্ষমতা ও শক্তির একটি সশস্ত্র বাহিনী থাকা দেশটির জন্য প্রাসঙ্গিক।’
তবে জার্মানি একাই মহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী তৈরি করছে—এমন ধারণা এড়িয়ে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে এই প্রতিরক্ষা সম্প্রসারণ সমন্বয় করা উচিত বলে তিনি যুক্তি দেন।
বেলা ব্রাইটনার আনাদোলুকে জানান, অনেক তরুণ এই বিতর্ককে সামরিকীকরণের দিকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর বিপক্ষে।’
ব্রাইটনার জানান, তাদের সংগঠন ইতোমধ্যে তিনটি ধর্মঘটের আয়োজন করেছে, যার প্রতিটিতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার স্পষ্টভাবে বলছে যে তারা ২০২৯ সালের মধ্যে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে চায়, আর আমরা এসব পদক্ষেপের মাত্র কয়েকটি দেখতে পাচ্ছি।’
সামরিকীকরণ প্রতিরক্ষা শিল্পকে লাভবান করলেও এটি সামাজিক পরিষেবা ও জীবনযাত্রার মানের ওপর চাপ বাড়ায় বলে ব্রাইটনার যুক্তি দেন। তিনি বলেন, ‘একটি নিরাপদ দেশ হলো সেটি, যা শান্তিতে থাকে এবং মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, সামরিক কাঠামো সম্প্রসারণ করে না।’
সামরিক বাহিনীতে যৌন হয়রানি ও ডানপন্থি চরমপন্থার অভিযোগের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, অনেক তরুণ সামরিক বাহিনীকে একটি নিরাপদ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করেন না।
জার্মান আইনের ছাত্র আহমেত দেভেসি আইনি, নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিরোধিতা করে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, জার্মানির সংবিধান বিবেকের তাড়নায় সামরিক সেবা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার দেয়। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার সম্প্রসারণ শেষ পর্যন্ত জার্মানিকে বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে বলেও দেভেসি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় হলো, জার্মানির তরুণদের এমন সব যুদ্ধে পাঠানো হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। দেভেসি রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদেরও সমালোচনা করেন। তিনি জানান, জার্মানি অন্যান্য দেশকে সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে নিজ সীমানার বাইরের সংঘাতেও জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে জার্মানি অনেক যুদ্ধকে সমর্থন করছে এবং যুদ্ধে অংশ নেওয়া অনেক দেশে অস্ত্র পাঠাচ্ছে।’
রাফায়েল লস জানান, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিতর্কটি একটি কঠিন রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে জার্মানির কট্টর ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) জন্য। কট্টর ডানপন্থিরা একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী সমর্থন করলেও গণতান্ত্রিক দলগুলো বুন্দেসভেয়ারকে ইউরোপীয় এবং ন্যাটো প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে।
লস বলেন, ‘জার্মান বুন্দেসভেয়ারের মধ্যে এএফডি মূলত জাতির জন্য একটি স্কুল দেখতে পায়।’ তবে জার্মানিতে যুদ্ধবিরোধী এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বড় ধরনের বিক্ষোভের ইতিহাস রয়েছে।
২০২২ সালের পর থেকে জার্মান জনসাধারণের মতামতেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন রাশিয়াকে ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে স্বীকার করছেন এবং সামরিক বাহিনীর বৃহত্তর ভূমিকা মেনে নিচ্ছেন। তা সত্ত্বেও, অনেক জার্মান নাগরিক ইউরোপের প্রভাবশালী সামরিক শক্তি হিসেবে জার্মানির কাজ করার ধারণা নিয়ে এখনো অস্বস্তিতে রয়েছেন বলে জানান লস। তিনি বলেন, ‘তারা জার্মানিকে ইউরোপ রক্ষার একক নেতা হিসেবে দেখে না। বরং তারা জার্মানিকে কয়েকটি দেশের একটি নেতৃস্থানীয় জোটের অংশ হিসেবেই দেখতে চায়।’
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.