গাজায় ‘হলুদ রেখা’র আড়ালে চলছে এক ভয়ংকর মৃত্যুখেলা
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যা করাকে দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত করেছে ইসরায়েলি সেনারা। এমনকি কিছু সেনার কাছে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের এই হত্যাকাণ্ড যেন আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সেনাদের দেওয়া চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গাজায় বর্বরোচিত এই হামলায় অংশ নেওয়া তিন ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সেনারা ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে গাজার বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। চোখের সামনে ঘটা এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হয়েই তারা মুখ খুলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সেনারা জানান, গাজার পরিস্থিতি ছিল একেবারেই জংলি পরিবেশের মতো এবং সেখানে ‘হলুদ রেখা’ অতিক্রম করলে বা তার কাছাকাছি গেলেই যে কাউকে সরাসরি গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
যুদ্ধবিরতির সময় নিয়মকানুন মেনে চলার বিষয়টিকে একটি তামাশা হিসেবে উল্লেখ করে সেনারা জানান, পরিচয় নিশ্চিত না হয়েই ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হতো। হত্যাযজ্ঞকে স্বাভাবিক কাজ হিসেবে নেওয়ার পাশাপাশি কিছু সেনা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে উল্লাস করত বলেও নিশ্চিত করেন তারা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ বন্ধের পরিকল্পনার প্রথম ধাপের আওতায় তথাকথিত হলুদ রেখায় নতুন করে সেনা মোতায়েনের পর গত অক্টোবরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়। গত জানুয়ারিতে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ধাপে ইসরায়েল আরও সেনা প্রত্যাহার করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। মূলত পূর্ব গাজার যেসব এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যেসব এলাকায় ফিলিস্তিনিদের থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তার মাঝখানের অস্থায়ী সীমানাকেই হলুদ রেখা বলা হয়। তবে ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর দাবি, গত কয়েক মাসে এই সীমানা ক্রমশ পশ্চিম দিকে সরিয়ে আনা হয়েছে।
অবরুদ্ধ এই উপত্যকার ভেতরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে বলে নিশ্চিত করেছেন ওই সেনারা। তাদের মতে, হলুদ রেখার আশপাশের নিয়মকানুন নিয়ে সেখানে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। সামরিক কমান্ডাররা প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি সমর্থন দেখালেও গোপনে গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন বলে জানান এক সেনা। তিনি জানান, গাজায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকার কাছাকাছি ফিলিস্তিনিদের একটি গাড়িতে হামলা চালিয়ে আরোহীদের সবাইকে হত্যার পর তার সহকর্মীদের উল্লাস ও একে অপরকে অভিনন্দন জানাতে দেখেছেন তিনি।
গত অক্টোবরে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এমন বর্বরোচিত দৃশ্য সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে বলে জানান ওই সেনা।
বিশোর্ধ্ব এক ইসরায়েলি সেনা বলেন, ‘আমি দেখেছি, হলুদ রেখা অতিক্রম করা বা এর কাছাকাছি আসা যে কাউকে ধাওয়া করার সুযোগ পেয়ে সেনারা উল্লাস করত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেখানকার পরিস্থিতি ছিল জংলি পরিবেশের মতো। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আমরা স্পষ্ট নির্দেশ পেয়েছিলাম, কেউ এই রেখা অতিক্রম করলেই তাকে সরাসরি গুলি করতে হবে।’
আরেক সেনা বলেন, ‘যা ঘটছে তাকে যুদ্ধবিরতি বলাটা স্রেফ একটি তামাশা।’
এপির প্রতিবেদনের বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করে, হলুদ রেখা সংলগ্ন এলাকাটি একটি সংবেদনশীল জায়গা এবং সেখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার নোটিশ দেওয়া রয়েছে। তাদের দাবি, শুধু রেখার কাছাকাছি আসার কারণেই তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায় না এবং শক্তি প্রয়োগের আগে নিয়ম অনুযায়ী সতর্ক করা হয়। তবে সরাসরি কোনো হুমকি তৈরি হলে বাহিনীর সদস্যরা হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
তবে এপি এবং ইসরায়েলি এনজিও ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর সঙ্গে কথা বলা এক সেনা জানান, অনেক সময় সেনারা অনেক দূরে অবস্থান করতেন এবং প্রচণ্ড মাঠপর্যায়ের চাপের মধ্যে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিতেন। এর ফলে লক্ষ্যবস্তুর পরিচয় যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। ওই সেনা জানান, গাজায় তার দ্বিতীয় মেয়াদের সামরিক দায়িত্ব পালনের সময় যুদ্ধবিরতি চুক্তি শুরু হয়েছিল। হলুদ রেখা থেকে কয়েকশ মিটার দূরে অবস্থান করার সময় এই রেখা অতিক্রমের চেষ্টাকালে গুলিতে কয়েকজনের নিহত হওয়ার দৃশ্য তিনি নিজ চোখে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন।
ওই সেনা আরও জানান, যারা গুলি করেন বা ড্রোন হামলার নির্দেশ দেন, তারা সব সময় রেখা অতিক্রমকারীদের পরিচয় জানতে পারেন না। তার দাবি, সেনারা বিমান হামলার জন্য অনুরোধ করার সময় বা কোনো নির্দিষ্ট ভবনের স্থানাঙ্ক পাঠানোর ক্ষেত্রে কেবলই অনুমান ও ধারণার ওপর নির্ভর করেন অথবা লক্ষ্যবস্তুকে সর্বশেষ যেখানে দেখা গিয়েছিল, তার ভিত্তিতে হামলা চালান।
‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ নিশ্চিত করেছে, গাজায় সাধারণ নিয়মকানুন অত্যন্ত শিথিল হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যারা সীমানা অতিক্রম করছে তাদের ওপর নির্বিচারে এই শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
গাজার মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৯২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৮১১ জন আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েল বর্বরোচিত এই যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৯৩৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.