গত রাতে হিউস্টন স্টেডিয়ামে জার্মানির গোল-উৎসবের সামনে কুরাসাও যখন ১-৭ ব্যবধানে চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছিল, তখন টিভির পর্দায় চোখ রাখা অনেক ফুটবল রোমান্টিকের বুকেই হয়তো একটা মৃদু মোচড় লেগেছে। বিশ্বকাপের বিশ্বায়নের এই যুগে কুরাসাও বা কেপ ভার্দের মতো পুঁচকে দলগুলোর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যারা নাক সিঁটকান, জার্মানির আক্রমণভাগের খুনে ফুটবল হয়তো তাদের যুক্তিকেই আরও পোক্ত করল। কাই হাভার্টজ আর জামাল মুসিয়ালারা মিলে বুঝিয়ে দিলেন, বিশ্বমঞ্চের রূপকথা আর রূঢ় বাস্তবের মধ্যে তফাৎটা আসলে কতটা চওড়া। লিভানো কোমেনেনসিয়ার ওই সান্ত্বনাসূচক গোলটি বাদ দিলে পুরো ম্যাচটাই ছিল একপেশে এক আত্মসমর্পণ।

২০২৬ বিশ্বকাপ ও কেপ ভার্দের রূপকথা: ব্লু শার্কসের স্বপ্নযাত্রার নেপথ্যে
ফুটবল দুনিয়ার নতুন বিস্ময়— 'ব্লু শার্কস'

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে। আটটি প্রধান ও বেশ কয়েকটি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশটি মূলত কেপ ভার্দে আর্কিপেলাগো নামে পরিচিত। আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই দ্বীপগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুর কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। প্রাকৃতিক দৃশ্য, সাদা বালির সৈকত এবং পরিষ্কার নীল জলরাশি দেশটিকে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। সাগরের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে কেপ ভার্দে মৎস্য সম্পদেও বেশ সমৃদ্ধ।

মানচিত্রের এক কোণে বিন্দুর মতো লেগে থাকা এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটিকে ফুটবল দুনিয়া চেনে 'ব্লু শার্কস' নামে। ২০২৬ বিশ্বকাপের আসরে তারাই এখন পরম বিস্ময়, এক নিটোল রূপকথা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে যখন তারা মূল পর্বের টিকিট কাটল, ফুটবল-বোদ্ধারা রীতিমতো অবাক হলেন। আফ্রিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ক্যামেরুনের মতো মহাশক্তিধর ‘অদম্য সিংহ’দের হারিয়ে গ্রুপ টেবিলের শীর্ষে থেকেই আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করেছে তারা। এই রূপকথা কোনো জাদুমন্ত্রে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে নিখুঁত পরিকল্পনা আর প্রবল জেদ।

ব্লু শার্কসের শক্তির মূল উৎস তাদের লড়াকু পরিচয়। কোচ বুবিস্তা যেন এক জাদুকর, যিনি দলটিকে আদ্যোপান্ত এক লড়াকু আত্মপরিচয় দিয়েছেন। মাঠে তাঁর প্রিয় ছক ৪-২-৩-১। তবে এই ছকের আসল সৌন্দর্য এর জমাট রক্ষণভাগে। বিপক্ষ দল আক্রমণ করতে এলে কেপ ভার্দে যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দেয়। জোনাল ডিসিপ্লিন বা আঞ্চলিক শৃঙ্খলার এমন প্রদর্শনী সচরাচর দেখা যায় না। তারা স্পঞ্জের মতো চাপ শুষে নিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে প্রতি-আক্রমণে যায়।

দলটির আসল ধার লুকিয়ে আছে দুই উইংয়ে। কাউন্টার-অ্যাটাকের সময় অভিজ্ঞ রায়ান মেন্দেস আর জোভান কাব্রালদের গতি যেন টর্নেডো। এই দলের একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে পর্তুগাল, ফ্রান্স কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপীয় লিগে খেলা প্রবাসী ও দ্বৈত-নাগরিকত্বের ফুটবলারদের নিয়ে। দেশের প্রতি এক অদ্ভুত টান আর নিরেট একতা এদের সুতোয় বেঁধে রেখেছে। যেহেতু হারানোর কিছু নেই, তাই এই ‘আন্ডারডগ’ দলটির মনে কোনো ভয়ডর নেই। ক্যামেরুনকে যারা ছিটকে দিতে পারে, কিংবা ২০২৩-এর আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের কোয়ার্টারে যারা বুক চিতিয়ে লড়তে পারে—তাদের চোখে তো বিশ্বজয়ের স্বপ্ন থাকবেই।

তবে রূপকথার গায়েও কিছু আঁচড় থাকে। কেপ ভার্দে দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের বেঞ্চের গভীরতা। প্রথম একাদশের ফুটবলাররা যতটা ধারালো, রিজার্ভ বেঞ্চ ততটাই নড়বড়ে। লোগান কস্তার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার যদি চোট পান কিংবা কার্ডের সমস্যায় পড়েন, তবে পুরো রক্ষণভাগ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। এছাড়া বক্সের মধ্যে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়ানোর মতো কোনো বিশ্বমানের স্ট্রাইকার তাদের নেই। বড় দলগুলো যখন হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলবে, তখন সেই চাপ সামলানোর টেকনিক্যাল সামর্থ্য হয়তো এই দ্বীপরাষ্ট্রের ছেলেদের কিছুটা কম আছে।

বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এইচ’ যেন এক জ্বলন্ত কড়াই, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন, উরুগুয়ে আর সৌদি আরব। বোদ্ধারা বলছেন, এই গ্রুপ থেকে কারা পরের রাউন্ডে যাবে, তা ঠিক করে দিতে পারে এই কেপ ভার্দেই। স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে তাদের লড়াইটা হবে স্রেফ টিকে থাকার। সেখানে তারা হয়তো ‘লো-ব্লক’ বা অতি-রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে ড্র করার চেষ্টা করবে। তবে আসল খেলা জমবে সৌদি আরবের বিপক্ষে। এই ম্যাচটিকেই তারা পাখির চোখ করছে। স্পেন বা উরুগুয়ের কাছ থেকে যদি কোনো পয়েন্ট কেড়ে নেওয়া যায় এবং সৌদি আরবকে হারানো সম্ভব হয়, তবে কেপ ভার্দে পেয়ে যাবে নকআউট পর্বের কাঙ্ক্ষিত টিকিট।

কাগজ-কলমে স্পেন আর উরুগুয়েই ফেভারিট, কিন্তু ফুটবল তো আর কাগজে খেলা হয় না। বড় দলগুলোর জন্য কেপ ভার্দে হলো পথের ধারের সেই ‘কলার খোসা’, যাতে পা দিলেই আছাড় খেতে হতে পারে।

ডা. আবু হেনা মোস্তফা বেলালক্রীড়া অনুরাগী ও লেখক।

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.