আপনি পড়ছেন

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্প আবারও প্রমাণ করেছে যে লাতিন আমেরিকা বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এক মিনিটের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই জোড়া ভূমিকম্পে অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং কারাকাস ও এর আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার বরাবর অবস্থিত হওয়ায় চিলি, পেরু, ইকুয়েডর, মেক্সিকো এবং ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলো ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।

লাতিন আমেরিকায় এক শতাব্দীর ভূমিকম্পের ইতিহাস
ইকুয়েডরের পেদেরনালসে ২০১৬ সালে আঘাত হানা ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের চিত্র

গত এক শতাব্দীতে এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এসব বিপর্যয়ের কারণে ধ্বংসাত্মক সুনামি সৃষ্টির পাশাপাশি আমেরিকা মহাদেশজুড়ে দুর্যোগ প্রস্তুতির ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

পশ্চিম ভেনেজুয়েলা (মাত্রা ৭.২ এবং ৭.৫)
২০২৬ সালের ২৪ জুন এক মিনিটেরও কম ব্যবধানে পশ্চিম ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ফলে কারাকাস, লা গুয়াইরা এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি ১৯০০ সালের পর ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প, যা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশে অনুভূত হয়। আবাসিক ভবন, হাসপাতাল এবং সরকারি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়ে, সেইসঙ্গে সড়ক, বিমানবন্দর এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে থাকা মানুষদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা, যেখানে অন্তত ১৬৪ জন নিহত, ৯৭১ জন আহত এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

দক্ষিণ হাইতি (মাত্রা ৭.২)
২০২১ সালের ১৪ আগস্ট হাইতির দক্ষিণাঞ্চলীয় উপদ্বীপে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে সুড, গ্র্যান্ড আন্স এবং নিপেস বিভাগ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুই হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন এবং কয়েক হাজার বাড়ি, স্কুল, গির্জা ও হাসপাতাল ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মইসি নিহত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেই এই বিপর্যয় ঘটে। ভূমিকম্পের কয়েক দিন পর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় গ্রেসের কারণে ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দিলে ত্রাণ তৎপরতা আরও ব্যাহত হয়। এটি ২০১০ সালের পর হাইতির সবচেয়ে প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে পরিণত হয়।

পেদেরনালস, ইকুয়েডর (মাত্রা ৭.৮)
২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল পেদেরনালসের কাছে ইকুয়েডরের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা উপকূলীয় মানাবি এবং এসমেরালদাস প্রদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। ৬৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত, ৬ হাজারের বেশি আহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। পেদেরনালস, মান্টা এবং পোর্তোভিজোর পুরো এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ভূমিকম্পে শত শত কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় এবং আধুনিক ইতিহাসে ইকুয়েডরের অন্যতম বৃহৎ পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করতে হয়।

ইকুইক, চিলি (মাত্রা ৮.২)
২০১৪ সালের ১ এপ্রিল ইকুইকের কাছে ৮ দশমিক ২ মাত্রার একটি সামুদ্রিক ভূমিকম্প আঘাত হানে। সুনামি সতর্কতা জারির পর চিলির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেয় কর্তৃপক্ষ। কিছু উপকূলীয় এলাকায় ২ মিটার (৬.৫ ফুট) পর্যন্ত উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এতে ছয়জনের মৃত্যু হয় এবং কয়েকশ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উন্নত জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা, সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং ভূমিকম্প-প্রতিরোধী অবকাঠামোর কারণে চিলিতে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।

মাউলে, চিলি (মাত্রা ৮.৮)
২০১০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চিলির মধ্যাঞ্চলে একুশ শতকের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, ৩ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয় এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ ক্ষতির শিকার হন। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামি চিলির বেশ কয়েকটি উপকূলীয় শহরে আঘাত হেনে প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা চিলির সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোর একটি।

মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকো (মাত্রা ৮.০)
১৯৮৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে ৮ দশমিক ০ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। মেক্সিকো সিটির সাবেক লেকবেড ভূমিকম্পের তরঙ্গকে তীব্রতর করায় রাজধানীতে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। শত শত অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, হাসপাতাল এবং অফিস ভবন ধসে পড়ে। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার, তবে স্বাধীন অনুমানে তা ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত ধরা হয়। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন এবং শত শত কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

আঙ্কাস, পেরু (মাত্রা ৭.৯)
১৯৭০ সালের ৩১ মে পেরুর আঙ্কাস অঞ্চলে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এর ফলে মাউন্ট হুয়াসকারান থেকে একটি বিশাল তুষারধসের সৃষ্টি হয়, যা কয়েক মিনিটের মধ্যে ইয়ুঙ্গাই শহরকে মাটিচাপা দেয়। প্রায় ৬৬ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং উত্তর পেরুজুড়ে প্রায় ৮ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে।

ভালদিভিয়া, চিলি (মাত্রা ৯.৫)
১৯৬০ সালের ২২ মে দক্ষিণ চিলিতে ৯ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে প্রায় এক হাজার ৬৫৫ জনের মৃত্যু হয়, ৩ হাজার মানুষ আহত হন এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামি হাওয়াই, জাপান এবং ফিলিপাইনে আঘাত হানার আগে চিলির উপকূলীয় সম্প্রদায়গুলোকে ধ্বংস করে দেয়।

চিলান, চিলি (মাত্রা ৮.৩)
১৯৩৯ সালের ২৪ জানুয়ারি চিলান এবং এর আশেপাশের এলাকায় চিলির অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক বিপর্যয় আঘাত হানে। এতে আনুমানিক ২৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। বাড়িঘর, স্কুল, গির্জা এবং সরকারি ভবন ধসে পড়ায় শহরের বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ভূমিকম্পের কারণে এক লাখের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন।

এসমেরালদাস, ইকুয়েডর-কলম্বিয়া (মাত্রা ৮.৮)
১৯০৬ সালের ৩১ জানুয়ারি এসমেরালদাসের উপকূলে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার একটি মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ফলে সৃষ্ট শক্তিশালী সুনামি কয়েক ঘণ্টা পর মধ্য আমেরিকা, হাওয়াই এবং জাপানের উপকূলে পৌঁছায়। ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয় এবং ইকুয়েডর ও কলম্বিয়ার উপকূলীয় সম্প্রদায়গুলো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.