কিছু স্টেডিয়াম শুধু ইট-সিমেন্টে গড়ে ওঠে না। সময়, স্মৃতি আর কিংবদন্তি মিলে তাদের আলাদা এক আত্মা তৈরি করে। মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকা তেমনই একটি জায়গা। এখানে ঢুকলে মনে হয়, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়—মানুষের বিশ্বাস, আনন্দ, কান্না আর ইতিহাসেরও একটি ভাষা।

এস্তাদিও আজতেকা: ইংল্যান্ডের কাছে এক পুরোনো অভিশাপ
আজতেকার ইতিহাস।

বিশ্বের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমীর কাছে আজতেকা তাই তীর্থস্থান। কিন্তু ইংল্যান্ডের কাছে? এই স্টেডিয়ামের নাম উচ্চারণ করলেই যেন বুকের ভেতর কোথাও পুরোনো এক ব্যথা টের পাওয়া যায়। এমন এক ব্যথা, যা সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়েছে, কিন্তু মুছে যায়নি।

রোববার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড আবার ফিরছে সেই আজতেকায়। প্রতিপক্ষ মেক্সিকো। তবে ইংল্যান্ডের লড়াই শুধু স্বাগতিক দলের সঙ্গে নয়; লড়াই ইতিহাসের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে আর প্রকৃতির সঙ্গেও।

আজতেকার গল্পে ইংল্যান্ডের প্রথম অধ্যায় খুললেই সামনে চলে আসে ১৯৮৬ সালের সেই দুপুর। দিয়েগো মারাদোনা। একটি হাত, যা রেফারি দেখেননি। আর কয়েক মিনিট পর এমন একটি গোল, যেটি দেখে পৃথিবী আজও বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। একই ম্যাচে ফুটবল তার সবচেয়ে বড় প্রতারণা আর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য—দুটোই দেখেছিল। ইংল্যান্ডের কাছে সেই ম্যাচ পরাজয়ের গল্প নয়, বরং এক ধরনের অভিশাপের গল্প।

সেই বিশ্বকাপ টেলিভিশনের সামনে বসে দেখেছিলেন জার্মানির এক কিশোরও। তাঁর নাম থমাস টুখেল। আজ তিনি ইংল্যান্ডের কোচ। চার দশক পর ইতিহাস যেন অদ্ভুত এক বৃত্ত এঁকে তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে সেই একই মঞ্চে।

টুখেল ইতিহাসকে অস্বীকার করেন না। বরং বিশ্বাস করেন, ইতিহাসেরও কখনো কখনো দেনাপাওনা মিটে যায়। সেন্ট জর্জস পার্কে গ্যারি লিনেকার আর পিটার শিলটনের ছবির দিকে তাকিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘কর্মফল একদিন ফিরে আসে। হয়তো আজতেকার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা এবার নতুন করে লেখার সময় এসেছে।’

কিন্তু ইতিহাসের চেয়েও কঠিন প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে মাঠে।

আজতেকার সবচেয়ে বড় শক্তি তার দর্শক নয়, তার উচ্চতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ২৪০ মিটার ওপরে বাতাসে অক্সিজেন কম। প্রথম কয়েক মিনিটেই শরীর বুঝিয়ে দেয়, এখানে ফুটবল খেলতে হলে শুধু দক্ষতা যথেষ্ট নয়; এখানে ফুসফুসেরও সাহস লাগে।

দৌড়ের পর দৌড়। বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বালা। শ্বাস যেন কিছুতেই পূর্ণ হয় না। আর পাতলা বাতাসে বলও যেন নিজের নিয়মে চলে। দূরের পাস আরও দূরে যায়, শটের গতি বদলে যায়, গোলরক্ষকের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।

টুখেল নিজেও বলেছেন, এখানে বলের আচরণ একেবারেই আলাদা। যে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ পুরো টুর্নামেন্টেই খুব বেশি নির্ভরতার ছবি দেখাতে পারেনি, তাদের জন্য এই পরিবেশ নতুন এক পরীক্ষা।

ইংল্যান্ড অবশ্য প্রস্তুতি নিয়েছিল বিজ্ঞানকে পাশে নিয়েই।

ব্রিটিশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ ছিল স্পষ্ট। হয় অন্তত ১০ দিন আগে এসে শরীরকে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, নয়তো ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে এসে নামতে হবে—যাতে শরীর পুরোপুরি প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ না পায়।

কিন্তু ফুটবলে সব সময় বিজ্ঞান জেতে না। অনেক সময় নিয়ম জিতে যায়।

ফিফার বাধ্যতামূলক অনুশীলনের নিয়মের কারণে ম্যাচের আগের দিনই মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছাতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। টুখেলের চোখে এটি স্বাগতিকদের জন্য স্পষ্ট সুবিধা। তাঁর হতাশা লুকানো ছিল না।

মাঠের বাইরেও লড়াই কম নয়।

ইকুয়েডরের অভিযোগ ছিল, শেষ বত্রিশের ম্যাচের আগের রাতে তাদের হোটেলের বাইরে আতশবাজির শব্দে ঘুমাতে দেওয়া হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার পর ইংল্যান্ড এবার নিজেদের হোটেলের ঠিকানাই গোপন রেখেছে। খেলোয়াড়দের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ইয়ারপ্লাগ, হোয়াইট-নয়েজ মেশিন ও ঘুমের সহায়ক প্রযুক্তি। বড় ম্যাচের প্রস্তুতি এখন শুধু অনুশীলনের মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এরই মধ্যে ডেকলান রাইসের শরীরও পুরোপুরি সঙ্গ দিচ্ছে না। কয়েক মাস ধরে হ্যামস্ট্রিংয়ের স্নায়বিক ব্যথা নিয়ে খেলছেন তিনি। কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ শেষে টুখেলকে বলেছিলেন, ‘ব্যথাটা অসহ্য।’ কিন্তু বিশ্বকাপে অনেক সিদ্ধান্ত শরীর নেয় না, মন নেয়। রাইসও খেলতে চান। তবে আজতেকার উচ্চতায় তাঁর প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি স্প্রিন্ট আলাদা করে নজরে থাকবে। অন্যদিকে জারেল কোয়ানসাহর ফেরার সম্ভাবনা অন্তত ইংল্যান্ডকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।

আর মেক্সিকো?

আজতেকায় তাদের আত্মবিশ্বাসের কারণ আছে। ২০১৩ সালের পর এই মাঠে তারা হারেনি। বিশ্বকাপে আজতেকায় তাদের ১০ ম্যাচের পরিসংখ্যান আরও বিস্ময়কর—৮ জয়, ২ ড্র, কোনো হার নেই। আটটি ম্যাচে প্রতিপক্ষ গোলই করতে পারেনি।

মেক্সিকো সিটির ক্যাফেগুলোয় এখন আলোচনার বিষয় একটাই—ইংল্যান্ড। স্থানীয় সমর্থকেরা এই প্রতিপক্ষকেই চেয়েছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস, ইংল্যান্ডের রক্ষণে ফাটল আছে। আর আজতেকা এমন এক মঞ্চ, যেখানে ছোট ফাটলও খুব দ্রুত বড় হয়ে যায়।

রোববার তাই শুধু একটি নকআউট ম্যাচ হবে না। দেখা যাবে, ইতিহাস কি সত্যিই কখনো বদলায়? চার দশক ধরে জমে থাকা স্মৃতি কি নতুন কোনো গল্প লিখতে পারে?

আর যদি পারে, সেই গল্প লিখতে হবে পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এক স্টেডিয়ামের বুকেই—যেখানে বাতাসও কখনো কখনো প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।

ডা. আবু হেনা মোস্তফা বেলাল, চিকিৎসক, ক্রীড়া বিশ্লেষক ও লেখক।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.