আপনি পড়ছেন

আধুনিক সমরাস্ত্রে মানববিহীন আকাশযান বা ড্রোন এবং রোবোটিক সিস্টেম এখন সামরিক কৌশলের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এসব প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের পর ন্যাটো তাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাশ্রয়ী ড্রোনের ওপর জোর দিচ্ছে। আসন্ন আঙ্কারা সম্মেলনে জোটটির ভবিষ্যৎ সামরিক রূপরেখায় এই রূপান্তর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

ন্যাটোর ড্রোন যুগ, গ্রে জোন ও ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ন্যাটোর সামরিক মহড়ায় একটি অত্যাধুনিক ড্রোন

সামরিক বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ড্রোনের বিবর্তন যেন সেই ‘কুৎসিত হাঁসছানা’র গল্পের মতোই, যা একসময় নিজের পরিচয় খুঁজত এবং চারপাশের অবজ্ঞার শিকার হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছে। এমনকি দ্বিতীয় কারাবাখ যুদ্ধের শেষেও সমসাময়িক প্রকাশনাগুলোতে ড্রোন ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে সীমিত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।

এর কয়েক বছর পর শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। রুশ ও ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা থেকে শুরু করে হামলা চালানো পর্যন্ত ৮০ শতাংশেরও বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে মানববিহীন সিস্টেমের মাধ্যমে। চলমান সশস্ত্র সংঘাতে দুই পক্ষের তথ্যে মিল পাওয়া কঠিন হলেও, কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের রোবোটিক সিস্টেমগুলো রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের ৩০ শতাংশকে যুদ্ধ থেকে ছিটকে দিতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, ন্যাটো স্টেডফাস্ট ডার্ট ২০২৬ মহড়ার সময় বায়রাকতার টিবি-৩ ড্রোনটি টিসিজি আনাদোলু যুদ্ধজাহাজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড্ডয়ন করে এবং বাল্টিক সাগরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর সফলভাবে ফিরে আসে। সংক্ষেপে বলা যায়, রোবোটিক যুদ্ধ ব্যবস্থার সোনালি যুগ এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এখন ন্যাটোর আসন্ন আঙ্কারা সম্মেলন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই নতুন সামরিক বাস্তবতায় জোটটির অবস্থান কোথায় হবে।

২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার ‘গেরবেরা’ মডেলের ড্রোন দিয়ে পোল্যান্ডের আকাশসীমায় ব্যাপক লঙ্ঘনের ঘটনা ন্যাটোর নিরাপত্তা পরিবেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে ন্যাটোর ‘ইস্টার্ন সেন্ট্রি’ মহড়া প্রমাণ করে যে, পূর্ব ইউরোপে জোটটির আকাশ প্রতিরক্ষা, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক-সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। তবে পোল্যান্ড ২০২৫-এর ঘটনার মূল তাৎপর্য কেবল কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূলত রাশিয়ার সামরিক অভিজাতরা ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়, নিয়মনীতি এবং অনুচ্ছেদ ৫-এর বিপরীতে স্বল্প ব্যয়ের আকাশসীমা লঙ্ঘনের প্রভাব পরীক্ষা করছে। এসব কার্যক্রম এমন এক ছায়া প্রচারণার অংশ, যা বড় আকারের সামরিক প্রতিক্রিয়া এড়াতে একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে থেকে চালানো হয়। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পাশাপাশি ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই ‘গ্রে-জোন’ বা ধূসর অঞ্চলের কার্যক্রম দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করছে।

এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত উত্তেজনা মনে হলেও, এটি ন্যাটোর বর্তমান কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জোটের এজেন্ডা এখন কেবল যুদ্ধ প্রস্তুতির বদলে যৌথ ডেটা আর্কিটেকচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং বহুমুখী সক্ষমতার দিকে সরে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে মানববিহীন নৌযান এবং মানববিহীন কমব্যাট এরিয়াল ভেহিকল কেবল নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধ নেটওয়ার্ককে রূপান্তরকারী নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যুদ্ধক্ষেত্রে এই রূপান্তরকে আরও দৃশ্যমান করেছে। স্বল্প ব্যয়ের সিস্টেম, সফটওয়্যার ইন্টিগ্রেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রায় রিয়েল-টাইম কৌশলগত অভিযোজন একসঙ্গে ফলাফল তৈরি করছে। ইউক্রেনের ‘ব্রেভ১’ এবং ‘এ১ সেন্টার’-এর মতো উচ্চ প্রযুক্তির উদ্ভাবনী গোষ্ঠীগুলো প্রমাণ করেছে যে, ন্যাটোর আমলাতান্ত্রিক ক্রয় প্রক্রিয়ার চেয়ে তারা কতটা দ্রুত কাজ করতে পারে। ইউরোপে রোবোটিক যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন এখন অন্যতম শীর্ষ প্রয়োগকারী দেশে পরিণত হয়েছে। তারা কামানের গোলার ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি এমন একটি অনুসন্ধান ও আক্রমণ ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা রুশ অনুপ্রবেশের গতি মন্থর করে দিয়েছে। ইউক্রেন এখন রাশিয়ার গভীরে কৌশলগত জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে আঘাত হানতে সক্ষম।

তবে প্রথাগত ফায়ারপাওয়ার পুরোপুরি ড্রোনের জায়গা নেবে, এমনটা ভাবা অবাস্তব। ন্যাটো বাহিনী এখনও কামান, সাঁজোয়া বাহিনী, মনুষ্যবাহী বিমান, দূরপাল্লার নির্ভুল হামলা এবং আকাশ প্রতিরক্ষার মতো বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করবে। স্নায়ুযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মহড়া ‘স্টেডফাস্ট ডিফেন্ডার’ এই নীতিগুলোকেই প্রতিফলিত করে। ন্যাটোর এই দৃষ্টিভঙ্গি ড্রোনগুলোকে এমন একটি নিয়ামক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা প্রথাগত সক্ষমতাকে আরও ধ্বংসাত্মক, নমনীয় এবং সাশ্রয়ী উপায়ে কাজ করতে সহায়তা করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে গেলে ইউরোপের মূল ঘাটতি কেবল যুদ্ধবিমান বা ট্যাংকের সংখ্যায় হবে না। প্রধান সমস্যা হবে যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ধরে যে গোয়েন্দা তথ্য, গভীর আক্রমণ, আকাশ প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, সাইবার এবং লজিস্টিক আর্কিটেকচার সরবরাহ করেছে, তার বিকল্প তৈরি করা।

পূর্ব দিকের মিত্রদের জন্য প্রধান সমস্যা হলো শাহেদ-গেরান এবং গেরবেরার মতো সস্তা ড্রোনগুলো ব্যয়বহুল অস্ত্র এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আটকে দিতে পারে। স্বল্প ব্যয়ের, অস্পষ্ট এবং সহজে শনাক্ত করা যায় না এমন ড্রোনগুলো পোল্যান্ড এবং রোমানিয়া সীমান্তে বড় হুমকি তৈরি করেছে। সস্তা ড্রোনের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিমান পাঠানো জোটের ঐক্য প্রমাণ করতে পারে, তবে এটি সাশ্রয়ী বা টেকসই কোনো প্রতিরক্ষা মডেল নয়। সস্তা ড্রোনের বিরুদ্ধে দামি মিসাইল ব্যবহার করা ন্যাটোর প্রতিরক্ষার জন্য কোনো টেকসই সমীকরণ হতে পারে না।

ড্রোনের এই প্রতিযোগিতায় গতির বিষয়টি ন্যাটোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রনিক যুদ্ধ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ড্রোনগুলো এখন মূল শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

ন্যাটোর ভবিষ্যৎ সামরিক রূপরেখা এমন দেশগুলো দ্বারা নির্ধারিত হবে, যারা মানববিহীন সিস্টেম, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, নিরাপদ সরবরাহ চেইন, মাইক্রোচিপ ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে স্বাধীনতা, পূর্ব দিকের প্রতিরক্ষা এবং বহুমুখী অভিযানকে সফলভাবে সমন্বয় করতে পারবে।

তাই আঙ্কারা সম্মেলন কেবল ব্যয় ভাগাভাগি নিয়ে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ হবে না, বরং ন্যাটো ইউক্রেনের অভিজ্ঞতাকে একটি অভিযোজনযোগ্য প্রতিরক্ষা-শিল্প এবং পরিচালনাগত এজেন্ডায় রূপান্তর করতে পারে কি না, তার পরীক্ষাও হবে। এক্ষেত্রে আয়োজক দেশের ভূমিকা মোটেও আকস্মিক নয়।

এই বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে, মানববিহীন সিস্টেমের ক্ষেত্রে তুরস্ক প্রাসঙ্গিক পরিচালনাগত এবং শিল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে ন্যাটোর অন্যতম মিত্র হিসেবে অবস্থান করছে। কারাবাখ, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইউক্রেনে বায়রাকতার টিবি২-এর যুদ্ধের রেকর্ড রুশ ও সোভিয়েত নির্মিত আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সাঁজোয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তুর্কি ড্রোনের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ২০২২ সালে শুরু হয়ে ২০২৪ সালে শেষ হওয়া পোল্যান্ডের ২৪টি বায়রাকতার টিবি২ ক্রয় এবং রোমানিয়ার বায়রাকতার টিবি২ চুক্তি প্রমাণ করে যে, তুর্কি ড্রোনগুলো ন্যাটোর পূর্ব এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সক্ষমতার অংশ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে ‘কিজিলেলমা’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো যদি পরিচালনাগতভাবে পরিপক্ব হয় এবং মিত্র বাহিনীর পরিকল্পনায় উপযুক্ত মিশন খুঁজে পায়, তবে এই পোর্টফোলিও আরও প্রসারিত হতে পারে।

ন্যাটোর বিরুদ্ধে এখন সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে ভুল তথ্য, সাইবার হামলা, নাশকতা, প্রক্সি অ্যাক্টর এবং ড্রোনের অনুপ্রবেশের মতো কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। ন্যাটোর এখন শুধু ড্রোনের চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন। জোটটির এমন একটি যুদ্ধ নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার দরকার, যা দ্রুত শিখতে, উৎপাদন করতে এবং আপডেট হতে পারে, যাতে অনুচ্ছেদ ৫-এর নিচে থাকা ধূসর অঞ্চলের চাপ মোকাবিলা করা যায়। আঙ্কারা সম্মেলনের প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তিগত দিকটি ঠিক এই ক্ষেত্রেই রূপ লাভ করবে।

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.