আপনি পড়ছেন

গাজায় ইসরায়েলের বর্বরোচিত যুদ্ধ এবং দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে চরম বেকারত্বে ভুগছেন ফিলিস্তিনি স্নাতকরা। বর্তমানে উপত্যকাটির ৮০ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং দারিদ্র্যের হার ৯৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের তীব্র সংকটের মধ্যেও টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেকেই এখন নিজেদের পেশা পরিবর্তন করে বেঁচে থাকার তাগিদে যেকোনো কাজ বেছে নিচ্ছেন।

ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই গাজায়
গাজায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের একটি তাঁবু শিবিরের দৃশ্য, যেখানে দূরে ইসরায়েলি হামলার ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে

মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চাকরির বিজ্ঞাপনের একটি লিংকে ঢোকার চেষ্টা করছেন রাওয়ান আল-জাবালি। বাস্তুচ্যুতদের এই শিবিরে ইন্টারনেট সংযোগ খুবই দুর্বল হওয়ায় বারবার পেজটি রিফ্রেশ করতে হচ্ছে তাকে। গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই বছর আগে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক শেষ করলেও এখন পর্যন্ত কোনো চাকরি পাননি তিনি। ইসরায়েলের নৃশংস যুদ্ধের কারণে পরিবার নিয়ে উত্তর গাজা থেকে নুসেইরাতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন রাওয়ান।

আল জাজিরাকে তিনি জানান, অনুবাদের ক্ষেত্রে ভালো সুযোগ পাবেন ভেবে তিনি এই বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধের পর কাজ করার মতো বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই ধ্বংস হয়ে গেছে।

সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৮০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বর্তমানে বেকার। যুদ্ধ এবং আগে থেকেই থাকা নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেখানে দারিদ্র্যের হার এখন ৯৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দুর্বল ইন্টারনেট এবং চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে চরম ক্লান্তির পরও হাল ছাড়েননি রাওয়ান। নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচাতে কোনো না কোনো উপায় বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

একই পরিস্থিতির শিকার মোহাম্মদ আল-খুদারিও। তিনিও গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। স্নাতক শেষের দিনটি নতুন পথের সূচনা মনে হলেও, বোমা হামলা, সীমান্ত অবরুদ্ধ থাকা এবং খাদ্যাভাবের কারণে শ্রমবাজার পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। আল-খুদারি তার দিনের বেশিরভাগ সময় ফোনে চাকরির বিজ্ঞাপন খুঁজে পার করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘ সময় ধরে চাকরির সুযোগ খুঁজি এবং ফোন চার্জ দেওয়া বা ইন্টারনেটে যুক্ত থাকতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়, তবুও আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

নিষ্ফল এই খোঁজাখুঁজি আল-খুদারিকে যেকোনো ধরনের চাকরি নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধ্য করেছে। প্রকৌশলের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো কাজ খুঁজছেন। আল-খুদারি জানান, তার মূল লক্ষ্য এখন এমন একটি আয়ের উৎস নিশ্চিত করা, যা দিয়ে তিনি নিজেকে ও পরিবারকে সাহায্য করতে এবং নতুন করে শুরু করতে পারেন। পরিস্থিতি বাধ্য করায় অনেক স্নাতক এখন নিজেদের বিষয়ের বাইরের যেকোনো চাকরিতে আবেদন করছেন।

গাজার এই বেকারত্ব সংকটের সঙ্গে ভূখণ্ডটির বৃহত্তর অর্থনৈতিক সমস্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে এখানকার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৮২ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সংঘাত এবং বিশেষ করে গাজার ওপর ইসরায়েলের অবরোধের কারণে উপত্যকাটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এখন আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

ফিলিস্তিনি অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আবু জেইয়াব ব্যাখ্যা করে জানান, ২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইসরায়েলের আরোপিত অবরোধের কারণে যুদ্ধের আগে থেকেই এখানকার শ্রমবাজার গভীর সংকটে ছিল। আর এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

তিনি বলেন, ‘এই অবনতির কারণে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব ও দক্ষতা হারানোর কারণে মানবসম্পদ নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদনশীল কাজের বদলে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

সংকট সমাধানে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার ওপর জোর দেন আবু জেইয়াব। তিনি জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পুনর্নির্মাণ শুরু করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা, প্রযুক্তি ও রিমোট ওয়ার্কে বিনিয়োগ করা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সমন্বয় করা জরুরি।

তবে গাজায় বর্তমানে সম্পূর্ণ কার্যকর কোনো সরকার নেই। অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও সেখানে নিয়মিত ইসরায়েলি হামলা চলছে এবং পুনর্নির্মাণের কাজ কার্যত অস্তিত্বহীন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও তরুণদের কাজ খুঁজে পেতে সাহায্য করার জন্য কিছু সামাজিক উদ্যোগ গড়ে উঠেছে।

দেইর এল-বালাহর ‘পিস ওয়ার্ক স্পেস’ তেমনই একটি জায়গা, যার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থী ও স্নাতকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটসহ কাজের উপযোগী পরিবেশ দেওয়া। এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল-বুহেইসি জানান, বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের কাজ ও পড়াশোনার জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এই স্পেসটি চালু করেন।

সৌর প্যানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় এটি পরিচালনা করা বেশ কঠিন হলেও কেন্দ্রে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। আল-বুহেইসি বলেন, ‘আমরা মাত্র ১০ জনের বসার মতো একটি ছোট জায়গা নিয়ে শুরু করেছিলাম এবং ধীরে ধীরে তা বাড়িয়ে আজ প্রায় ৮০ জনে উন্নীত করেছি।’

তিনি আরও জানান, তাদের লক্ষ্য সবসময়ই এমন একটি উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়া, যা শিক্ষার্থী ও স্নাতকদের সেরা উপায়ে পড়াশোনা ও কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে। এই স্পেসের নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ শুধু চাকরিপ্রার্থীদের জন্যই নয়, যারা রিমোট ওয়ার্ক করছেন বা পরীক্ষা দিচ্ছেন তাদের জন্যও একটি বড় আশীর্বাদ।

কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক সংকোচন এবং শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের কারণে ফিলিস্তিনের হাজার হাজার স্নাতক এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপান্তর পর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। চাকরি খোঁজা, নিজ বিষয়ের বাইরে কাজ গ্রহণ করা বা রিমোট ওয়ার্কের মাধ্যমে বিকল্প খোঁজার মধ্য দিয়ে একটি নতুন শ্রম বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।

আল-বুহেইসি বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টির সবচেয়ে টেকসই উপায় হলো প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বিনিয়োগ করা। তাই শুধুমাত্র সীমিত স্থানীয় সুযোগের ওপর নির্ভর না করে অনলাইনে আয় করার জন্য তরুণদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া অপরিহার্য।’

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.