আপনি পড়ছেন

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাসনে থাকা দলীয় নেতাদেরও তার সঙ্গে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন।

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কতটা বাস্তবসম্মত?
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা

তবে এটি তার প্রকৃত পরিকল্পনা নাকি দলের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার কোনো রাজনৈতিক কৌশল, তা নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের ভেতরেই অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনেক দলীয় নেতা মনে করেন, শেখ হাসিনা নিজে ফিরবেন কি না তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কতজন নেতাকর্মী এমন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত হবেন।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান তিনি, যার মাধ্যমে তার সাড়ে ১৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শাসনের অবসান ঘটে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টের ওই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাদের অবস্থান করার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। দেশে থাকা অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর থেকে দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা মূলত অনলাইনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঝটিকা মিছিল দেখা গেলেও, সেগুলো দলের সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দেওয়ার চেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা হিসেবেই বেশি দেখা হয়।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি বলেন, ‘আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মীরা চরম দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যু আসে, আমি আমার নিজের মাটিতেই মরতে চাই—যেখানে আমার মা-বাবার কবর রয়েছে এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।’

তবে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, ডিসেম্বরের এই সময়সীমাটি প্রতীকীও হতে পারে। এটি মূলত নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা, দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে চাপ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক পরিসর পুনরুদ্ধারের একটি কৌশল হতে পারে।

এর আগে ২৮ জুন ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও চলতি বছরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার এই মন্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের কয়েকটি অভ্যন্তরীণ অনলাইন বৈঠকের পর দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি ডিসেম্বরে ফেরার কথা বলেছেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার মতে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে শেখ হাসিনা বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের দেশে ফেরার জন্য বারবার তাগিদ দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো শীর্ষ নেতা তাতে সাড়া দেননি। উল্টো নিরাপত্তা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অনেকেই ভারত ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনা করে। এ সময় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে শত শত হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও শেখ হাসিনা ও দলের বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে।

গত বছরের ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে আরও বেশ কয়েকটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনা ও অন্যান্য সাজাপ্রাপ্তদের ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারকে চিঠি দেয়। ভারত বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানালেও হস্তান্তরের বিষয়ে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও আদালতের রায় কার্যকরের জন্য শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা জানিয়েছে। নয়াদিল্লিতে তার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান এবং বাংলাদেশের হস্তান্তরের অনুরোধ দুই দেশের সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার খবর প্রকাশ্যে আসার পর আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, এই ঘোষণার পেছনের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল বা প্রস্তুতি সম্পর্কে তারা অবগত নন।

আগামী ডিসেম্বর আসতে আরও প্রায় পাঁচ মাস বাকি। এই সময়ের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের অবস্থান, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) মতো বিরোধী দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, শেখ হাসিনা ৪৪ বছর ধরে দলের সভাপতি এবং তার ব্যাপক আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রয়েছে। তিনি দলের বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থা সম্পর্কেও পুরোপুরি সচেতন। তাই প্রকাশ্যে ফেরার ঘোষণা দেওয়ায় তার হয়তো নিজস্ব কোনো প্রস্তুতি রয়েছে, তবে দলের নিজস্ব প্রস্তুতি বা কৌশল এখনো অস্পষ্ট। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় তারা কতটা কার্যকরভাবে প্রকাশ্যে সংগঠিত হতে বা সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

ওই নেতা আরও জানান, বিদেশে আর্থিকভাবে সচ্ছল ও নিরাপদে থাকা অনেক নেতাকর্মী কেবল শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশে ফিরে কারাবরণ করতে চাইবেন না। তার মতে, রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। ফলে শেখ হাসিনার ঘোষণা দলীয় সদস্যদের মধ্যে আবেগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত এটি কোনো বড় আকারের সম্মিলিত প্রত্যাবর্তনে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে তাকে হস্তান্তরের দাবি জানালেও তিনি নিজ ইচ্ছাতেই দেশে ফিরতে চান।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই মামলা রয়েছে এবং অনেকে আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি তাদের বলেছি, এবার আমি বাংলাদেশে ফিরছি। একদিন আপনাদের সবাইকে আসতে হবে। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’ বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষ বুঝতে পারবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক। আর ঠিক এটাই আমি প্রমাণ করতে চাই।’

দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা যেকোনো সরকারের ভুল হওয়া স্বাভাবিক উল্লেখ করে শেখ হাসিনা জানান, তার প্রশাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা বিচারের অধিকার কেবল জনগণেরই রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি দোষী সাব্যস্ত হলেও বা নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হলেও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখা উচিত নয়।’ তার মতে, দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ, সরকার নয়। দল গোছানোর অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন বলেও দাবি করেন।

জনগণের ওপর বিচারের ভার ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেও ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। উল্টো তিনি ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা এই আন্দোলনকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফসল হিসেবে আখ্যায়িত করে অভ্যুত্থানের নেতাদের প্রতি আক্রমণাত্মক সুর বজায় রেখেছেন। ফলে দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও, অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো আত্মসমালোচনা বা দায় স্বীকারের লক্ষণ এতে দেখা যায়নি।

বেশ কয়েক মাস ধরেই শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মাঠে ফিরে আসা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি প্রচার করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের এসব বিবৃতির পেছনে ভারতের নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের সমর্থন বা সমন্বয় থাকতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের মন্তব্য দেশের ভেতরে এরই মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, অভ্যুত্থানের বার্ষিকী এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের বিষয়টি তার এই ঘোষণার সময় নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও ভারত তাকে কেন্দ্র না করেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ আমরা একটি সাক্ষাৎকারে দেখলাম যে একজন ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশ ইতিমধ্যে ১৬ বছরের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এখন আমরাও চাই তিনি ফিরে আসুন—যাতে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করা যায়।’

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, পুরো বিষয়টি আইনের আওতাভুক্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি দেশের গণমাধ্যম আদালতের আদেশ মেনে চলবে বলে আস্থা প্রকাশ করেন। মন্ত্রী আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার মন্তব্য অস্থিরতা তৈরির ক্ষমতা রাখে এবং সরকার পুরো বিষয়টি কঠোরভাবে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছে।’

প্রথম আলো অবলম্বনে

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.