ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি বিতর্কিত পরিকল্পনার জেরে বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকি দিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। ফিফার প্রতিযোগিতাগুলো পরিচালনার জন্য গঠিত একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনার প্রতিবাদে এই প্রতিক্রিয়া দেখায় সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার ৩০ জুলাই এক বিবৃতিতে উয়েফা এই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে।

ইনফান্তিনো অধ্যায়ের কি সমাপ্তি, বিশ্বকাপ বয়কট করবে উয়েফা?
উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিন ও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

প্রস্তাবিত ওই কোম্পানিটি ফিফা পরিচালনা করলেও এর আংশিক অর্থায়ন আসবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। এসব বিনিয়োগকারীর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতার ভাই জশুয়া কুশনারও রয়েছেন।

এই পরিস্থিতির পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ধোঁয়াশা রয়েছে। পোল্যান্ডের আয়োজনে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউরোপীয় ফুটবলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সামগ্রিক নীতি নির্ধারণের সময় বিস্তারিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়েছিল কি না তা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।

ইনফান্তিনোর অর্থায়ন চুক্তিটি গৃহীত হলে উয়েফার বয়কটের হুমকি কার্যকর হবে। দেশগুলোর জন্য ফিফার চুক্তি গ্রহণ এবং ১ জানুয়ারি ২ কোটি ডলার পাওয়ার সময়সীমা ১৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে তাত্ত্বিকভাবে কোয়ার্টার ফাইনালের মাঝামাঝি বা সেমিফাইনালের আগে দেশগুলো টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে পারে।

এরপর অক্টোবরে নারী বিশ্বকাপের প্লে-অফ ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশ অংশ নেবে। উয়েফার সহ-সভাপতি এবং ওয়েলসের সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভকে জানান, শরৎকালে নারী বিশ্বকাপের প্লে-অফে ওয়েলস অংশ নেবে এবং এটি হবে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ বাছাই। তিনি আরও বলেন, ‘এসব প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়ার কথা কেউ চিন্তাও করতে পারে না।’

লরা স্পষ্ট করে বলেন, ‘এটি উয়েফার তৈরি করা কোনো সমস্যা নয়, বরং ফিফার সৃষ্টি করা সমস্যা। সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে খেলোয়াড় বা দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা কেউ চায় না। আমাদের এই কোণঠাসা পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং এর দায় ফিফার।’

এখন কী ঘটবে বা ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। উয়েফার বিবৃতির পর উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও আরেকটি বিবৃতি দেয়। এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক এই সংস্থাটি জানায়, তাদের ৪১টি সদস্য দেশ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে এক অর্থে এটি শুধু ফিফার অভ্যন্তরীণ বিতর্ক নয়। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) চেয়ারপারসন ডেবি হিউইট একইসঙ্গে ফিফার সহ-সভাপতি। বৃহস্পতিবার উয়েফার জরুরি বৈঠকে তিনি এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কথা বলেন। এফএ এক বিবৃতিতে জানায়, এই বিষয়ে তারা ইউরোপীয় সহকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্কটিশ এফএ-এর সভাপতি মাইক মুলরেনি ফিফার অর্থ বিষয়ক কমিটিরও প্রধান। স্কটিশ এফএ তাদের বিবৃতিতে জানায়, সংস্থাটি উয়েফার অবস্থানের সঙ্গে দ্ব্যর্থহীনভাবে একমত। যারা এই বিষয়ে কথা বলেছেন, তারা প্রস্তাবের পাশাপাশি ইনফান্তিনোর সঠিক আলোচনা ও সংলাপের অভাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। উয়েফার জরুরি বৈঠকের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে একটি সূত্র শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করে, ‘ক্ষোভ।’

এদিকে ফিফা একটি নতুন বিবৃতি প্রকাশ করে দাবি করে যে, গণমাধ্যমের ভুল প্রতিবেদনের কারণে প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা ব্যাহত হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, তারা জনসমক্ষে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগকে সম্মান করে এবং একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে। ফিফা স্পষ্ট করে জানায়, কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না এবং ফিফা কখনোই এমন কিছু প্রশ্রয় দেবে না।

২০১৬ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান আল-খলিফাকে ১১৫-৮৮ ভোটে হারিয়ে ফিফা সভাপতি হন ইনফান্তিনো। মার্চে চতুর্থ মেয়াদের জন্য এই সুইস নাগরিকের নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা রয়েছে। চলতি সপ্তাহের আগে ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হবেন। ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন এফএ ইতোমধ্যে ৫৬ বছর বয়সী এই কর্মকর্তাকে সমর্থন দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছিল।

তবে বিভিন্ন তথ্যমতে, ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি কনকাকাফের বেশিরভাগ সদস্য ফিফা সভাপতির খেলা পরিচালনার সক্ষমতার ওপর আস্থা হারাচ্ছেন বা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। এখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কাউকে খুঁজে বের করার আলোচনা চলছে।

এক্ষেত্রে নাসের আল-খেলাইফির নাম উঠে এসেছে, যা বেশ স্বাভাবিক। কাতারের নাগরিক আল-খেলাইফি ইতোমধ্যেই ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী প্যারিস সেন্ট-জার্মেইর (পিএসজি) সভাপতি হিসেবেই নন, ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর নেতৃত্বেও রয়েছেন।

২০২১ সালে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ নামের বিতর্কিত টুর্নামেন্টটি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভেস্তে যাওয়ার পর তিনি ইউরোপিয়ান ক্লাবস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। আল-খেলাইফির নেতৃত্বে এর নাম পরিবর্তন করে ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবস রাখা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি এর সদস্য সংখ্যা ৮০০-এর বেশি উন্নীত করেছেন। বড় ক্লাবগুলোর মধ্যে কেবল রিয়াল মাদ্রিদ এর বাইরে রয়েছে।

তাত্ত্বিকভাবে তিনি ইনফান্তিনোকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য সেরা ব্যক্তি হতে পারতেন। তবে তিনি তা চান না। বৃহস্পতিবার এই সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে ৫২ বছর বয়সী এই কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানায়, তিনি সত্যিই এই দায়িত্ব নিতে চান না।

ঐতিহাসিকভাবে, আসীন ফিফা সভাপতিরা নির্বাচনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন না। ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জের কাছে হেরে যাওয়া ইংরেজ স্যার স্ট্যানলি রাউস ছিলেন নির্বাচনে পরাজিত সর্বশেষ সভাপতি। ইনফান্তিনো তার পদ ধরে রাখতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি জানি না।’

এফএ-এর সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনকেও একই প্রশ্ন করে বিবিসি স্পোর্ট। জবাবে বার্নস্টেইন বলেন, ‘সাধারণ কোনো সংস্থা হলে, এত বড় কোনো ঘটনার কারণে পিছু হটতে বাধ্য হলে তাকে সম্ভবত বিদায় করে দেওয়া হতো। কিন্তু ফিফা সাধারণ কোনো সংস্থা নয়। যদি তার প্রতি জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনগুলোর পর্যাপ্ত সমর্থন থাকে, তবে তিনি চালিয়ে যাবেন।’

উয়েফার সাবেক প্রধান নির্বাহী লারস-ক্রিস্টার ওলসন বিবিসিকে জানান, ইনফান্তিনো নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং তার অবস্থান হুমকিতে পড়তে পারে। তিনি মত দেন যে, ফিফায় এমন একটি সংস্কার আনা উচিত যেখানে ইনফান্তিনো এবং তার পূর্বসূরি সুইজারল্যান্ডের সেপ ব্লাটার বা ব্রাজিলের হ্যাভেলাঞ্জের মতো কাউকে একক ক্ষমতা না দিয়ে বিভিন্ন কনফেডারেশনের প্রতিনিধিদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সভাপতির দায়িত্ব আবর্তিত হবে। ইনফান্তিনোকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত কি না জানতে চাইলে ওলসন বলেন, ‘আমি মনে করি এটি ফুটবলের জন্য একটি নতুন সূচনা হওয়া উচিত।’

ফিফার ২১১টি জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে উয়েফার অধীনে মাত্র ৫৫টি দেশ থাকলেও, খেলার দিক থেকে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী কনফেডারেশন। ফিফার প্রধান ইভেন্টগুলোর মধ্যে সর্বশেষ বিশ্বকাপ, নারী বিশ্বকাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপে চার সেমিফাইনালিস্টের তিনটিই ছিল উয়েফার।

ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয়দের অংশগ্রহণ না থাকলে এর বাণিজ্যিক প্রভাব হবে ভয়াবহ। সেক্ষেত্রে জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনগুলোর কাছে চিঠিতে ইনফান্তিনো ৪ হাজার কোটি ডলারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণের কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না।

ডেভিড বার্নস্টেইন মনে করেন, এর একটি সমাধান বের করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে দীর্ঘমেয়াদে কোনো বিভাজন তৈরি হবে, কারণ এতে সবারই ক্ষতি। নিজেদের প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে না খেলানোর ঝুঁকি ফিফা নিতে পারবে না এবং সত্যি বলতে ইউরোপও এর বাইরে থাকার ঝুঁকি নিতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে ইনফান্তিনোকে পিছু হটতেই হবে। এই চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এটি বন্ধুদের মধ্যে করা চুক্তি এবং এটি সঠিক নয়। তারা যদি মূলধন বাড়াতে চায়, তবে আরও ভালো উপায় রয়েছে।’

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.