কলম্বিয়ার রাজনীতিতে পালাবদল, নিঃসঙ্গ বিদায় নিলেন পেত্রো
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কলম্বিয়ার প্রথম প্রগতিশীল সরকারের মেয়াদের শেষ মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত সাদামাটা ও নিঃসঙ্গ। ক্ষমতা হস্তান্তর করে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ছেড়েছেন গুস্তাভো পেত্রো, অন্যদিকে আরেক শহরে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আবেলাার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে চলমান তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

৭ আগস্ট প্লাজা দে আরমাসের পাথুরে আঙিনা দিয়ে শেষবারের মতো হেঁটে যান পেত্রো। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সাধারণ সাদা পোশাকে থাকা পরিবারের সদস্য এবং মন্ত্রিসভার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সদস্য। প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড ব্যাটালিয়নের পাহারায় তারা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসেন।
বিদায় অনুষ্ঠানটি ছিল পুরোপুরি নিয়মমাফিক। সেখানে কোনো উল্লসিত জনতা, ব্যানার বা রাষ্ট্রীয় প্রতীকের আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর ছিল না। এমনকি পেত্রোর পরনে কোনো জমকালো পোশাকও ছিল না। এই নিঃসঙ্গ বিদায়ের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে ক্যালি শহরে। সেখানে বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তি ও কানায় কানায় পূর্ণ দর্শকদের সামনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবেলাার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া।
বিদায়বেলার প্রটোকল শুধু সংবিধানের বাধ্যবাধকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেনশিয়াল স্যাশ হস্তান্তরের নিয়মটিও এড়িয়ে যাওয়া হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পেত্রো নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি নতুন প্রশাসনকে অবৈধ সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করে ১ হাজার ৬০০টির বেশি ভোটকেন্দ্রে পদ্ধতিগত কারচুপির অভিযোগ তোলেন।
প্রাসাদ ছাড়ার সময় পেত্রো স্পষ্ট করে দেন যে তিনি রাজনৈতিক জীবন থেকে অবসর নিচ্ছেন না। বরং ক্ষমতার বাইরে থেকে শক্তিশালী বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি সরাসরি রাজপথে নামার ঘোষণা দেন।
২০২২ সালের আগস্টে পেত্রো যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন সেটিকে কলম্বিয়ার ইতিহাসের একটি বড় মোড় হিসেবে দেখা হয়েছিল। এম-১৯ গেরিলা আন্দোলনের সাবেক সদস্য এবং প্রবীণ সিনেটর পেত্রো একটি উচ্চাভিলাষী ও রূপান্তরমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে সম্পদের সুষম বণ্টন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে বৈশ্বিক রূপান্তর এবং গ্রামীণ সংঘাতে বিপর্যস্ত দেশে সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কিন্তু চার বছরের মেয়াদ শেষে পেত্রোর সরকার একটি গভীর বিতর্কিত উত্তরাধিকার রেখে গেল, যা মূলত তার বড় বড় আদর্শিক বুলি এবং সরকার পরিচালনার বাস্তবতার মাঝখানে আটকে ছিল।
পেত্রোর মূল লক্ষ্য ছিল জনজীবনের তিনটি প্রধান স্তম্ভ। এগুলো হলো—রাষ্ট্র পরিচালিত সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করতে বেসরকারি হেলথ প্রমোশন এন্টিটি (ইপিএস) বাতিল করা, নিম্ন আয়ের বয়স্ক নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় পেনশন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (ইএলএন), ফার্কের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও শক্তিশালী অপরাধী চক্রসহ অবশিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।
শুরুতে গতি পেলেও এসব কাঠামোগত পরিকল্পনার বেশিরভাগই পরে ভেস্তে যায় বা আটকে থাকে। স্বাস্থ্যসেবা বিল নিয়ে বিতর্কের জেরে ২০২৩ সালের শুরুতে পেত্রোর বৃহত্তর আইনপ্রণেতা জোট ভেঙে যায়। কংগ্রেসে স্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তার মূল উদ্যোগগুলো বারবার বাধাগ্রস্ত, বিলম্বিত বা দুর্বল হয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একসঙ্গে একাধিক অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে অপরাধী সংগঠনগুলো তাদের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক শক্তি বাড়ানোর সুযোগ পায়।
তবে তিনি দারিদ্র্য ও বেকারত্ব হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিলেন। পাশাপাশি আরও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রেসিডেন্সিতে প্রবেশের সুযোগ প্রসারিত করেছিলেন, যা ২০২২ সালের আগে অসম্ভব ছিল।
দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও পেত্রোর প্রশাসন বারবার বিতর্কের মুখে পড়ে, যা তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্যোগ ত্রাণ তহবিল আত্মসাৎ এবং সংস্কার বিলে ভোটের বিনিময়ে কংগ্রেস নেতাদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২০২২ সালের নির্বাচনে অবৈধ প্রচার তহবিলের অভিযোগ ওঠার পর ২০২৩ সালে অর্থ পাচারের মামলায় প্রেসিডেন্টের ছেলে নিকোলাস গ্রেপ্তার হন।
২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে জাতীয় নির্বাচন কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষা শুরু করে, যা বছরের পর বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। ক্ষমতার শেষ সপ্তাহগুলো পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ বলয় ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে সরকার পরিচালনা ও রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে পরিবারের সদস্য এবং সাবেক মিত্রদের প্রকাশ্য সমালোচনাও ছিল।
পুরো মেয়াদজুড়ে পেত্রোর শাসনপদ্ধতি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজনকে আরও গভীর করেছে। তিনি প্রায়ই উচ্চ আদালত, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং প্রধান ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর সঙ্গে প্রকাশ্য বিবাদে জড়িয়েছেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতাকে তার সরকারের বিরুদ্ধে নীরব অভ্যুত্থানের চেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, শ্রমিক সংগঠন এবং প্রান্তিক মানুষের মধ্যে তার জোরালো সমর্থন থাকলেও তার এই সংঘাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যবিত্ত শহুরে ভোটার এবং ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে দূরে সরিয়ে দেয়।
অনলাইনে প্রকাশিত নিজের শেষ ছবিগুলোর একটিতে পেত্রোকে তার কার্যালয়ে সিমন বলিভারের প্রতিকৃতির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি এটিকে পরিত্যক্ত প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে তার সংগ্রামের সঙ্গী হিসেবে উল্লেখ করেন। মূলত তার উত্তরসূরি কাসা দে নারিনোতে থাকবেন না বলে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এটি ছিল তারই ইঙ্গিত।
অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পদক্ষেপ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়ে কলম্বিয়ার জাতীয় আলোচনাকে নতুন রূপ দিতে পেত্রো সফল হয়েছিলেন। কিন্তু তার এই বিস্তৃত রূপকল্পকে স্থায়ী আইনি সাফল্যে পরিণত করতে না পারায় তাকে একাকীত্বের মধ্য দিয়েই মেয়াদ শেষ করতে হলো।
বিদায়ী প্রেসিডেন্টকে বহনকারী গাড়িটি যখন বোগোতার নীরব চত্বর ছেড়ে যাচ্ছিল, তখন ক্যালি শহরে করতালির মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায়কে স্বাগত জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে এমন এক দেশ পেছনে পড়ে রইল, যার নেতারা যেমন ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত, তেমনি জাতিও তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চরমভাবে বিভক্ত।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.