মহেশখালীতে এলএনজি সরবরাহ কমেছে ৬৩%, গ্যাস সংকট তীব্র
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত সক্ষমতার তুলনায় বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩৭ শতাংশ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়। চাহিদার তুলনায় সেখানে প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাসের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাবান্নাও।
পেট্রোবাংলার উৎপাদন ও বিপণন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ১০টা পর্যন্ত মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪১০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০০ এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ পূর্ণ সক্ষমতার তুলনায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৬৩ শতাংশ।
পেট্রোবাংলার উপমহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন ও বিপণন) প্রকৌশলী মোহা. মাহমুদুল হাসান জানান, এক্সিলারেট এনার্জির দুটি বয়লারের একটি বর্তমানে চালু রয়েছে। অপরটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। মেরামতকাজ শেষ হলে দ্বিতীয় বয়লারও চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, শুধু এক্সিলারেটের কারিগরি সমস্যাই নয়, সামিটের টার্মিনালেও আবহাওয়াজনিত সমস্যা তৈরি হয়েছে। সেখানে একটি এলএনজি জাহাজ অবস্থান করলেও বাতাসের গতিসহ বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেটি নিরাপদে বার্থিং করতে পারছে না। ফলে জাহাজ থেকে এলএনজি খালাসের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে এলে জাহাজটির অপারেশন শুরু হবে বলে জানান তিনি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কারিগরি দল প্রস্তুত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এলএনজি সরবরাহও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মহেশখালীর সরবরাহ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ এমএমসিএফডি। বিপরীতে বুধবার সকালে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ২১০ এমএমসিএফডি।
এ হিসাবে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ এমএমসিএফডি বা ৪০ শতাংশ।
কেজিডিসিএলের ইঞ্জিনিয়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরবরাহের ভিত্তিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ যাতে পুরোপুরি বন্ধ না হয়, সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ ২৩০ থেকে ২৩৪ এমএমসিএফডির মধ্যে ছিল। তবে দুপুরের পর সরবরাহ কমতে শুরু করে। রাতে তা আরও কমে যাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নগরীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ যানজট। মুরাদপুরের ফসিল পেট্রোল পাম্পে বুধবার সকাল ১১টার দিকে দেখা যায়, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন যানবাহন।
চালক আকতার হোসেন জানান, তিনি সকাল ৮টা থেকে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। কয়েক দিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার পর মঙ্গলবার থেকে আবারও সমস্যা শুরু হয়েছে।
ফসিল পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক মো. ফখরুদ্দীন ইসলাম শিমুল বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক গতিতে সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, সাধারণ সময়ে পাম্পে গ্যাসের চাপের রিডিং প্রায় ২২০ থাকলেও বর্তমানে তা ১৫০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে।
নগরীর ওয়াসার মোড় এলাকার এস এইচ খান সন্স সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সেখানে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলেও কখন সরবরাহ শুরু হবে, সেই অপেক্ষায় গাড়িগুলো লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল।
সিএনজি চালক মোহাম্মদ শফিক বলেন, তিনি সকাল ৬টা থেকে লাইনে রয়েছেন। গ্যাস কখন পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। প্রতিদিন গাড়ির জন্য ১ হাজার ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। ফলে আয় না করেও ভাড়া পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে।
টাইগারপাস এলাকার রেইনবো সিএনজি স্টেশন লিমিটেডেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। এতে বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা, যানজট ও চালকদের আয় কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শুধু পরিবহন ও শিল্প খাত নয়, গ্যাস সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরাও। হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আফজল ফরমান বলেন, বিদ্যুতের সমস্যার সঙ্গে নতুন করে গ্যাস সংকট যুক্ত হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বাসায় রান্নাবান্না করতেও সমস্যা হচ্ছে।
এদিকে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক খন্দকার বেলায়েত হোসেন।
তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেভাবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পরিস্থিতির বুলেটিন প্রকাশ করা হতো, একইভাবে গ্যাস পরিস্থিতি নিয়েও দৈনিক বুলেটিন প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তার মতে, ওই বুলেটিনে দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা, উৎপাদন ও সরবরাহ, ঘাটতির পরিমাণ, জাতীয় গ্রিডে এলএনজির অবদান এবং বিদ্যুৎ, শিল্প, সার ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহের তথ্য থাকা উচিত।
এ ছাড়া কোন এলাকায় কত ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, কোথায় গ্যাসের চাপ কত এবং সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে—এসব তথ্যও নিয়মিত প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
খন্দকার বেলায়েত হোসেন বলেন, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, এলএনজি আমদানির অগ্রগতি এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—সেসব তথ্যও জানানো দরকার। এতে সংকটের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে, গুজব ও বিভ্রান্তি কমবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি বাড়বে।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরে ৬ আগস্ট একটি বয়লার চালুর মাধ্যমে আংশিকভাবে সরবরাহ পুনরায় শুরু হলেও দ্বিতীয় বয়লারটি এখনো মেরামতের আওতায় রয়েছে।
অন্যদিকে, সামিটের টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি বহনকারী জাহাজ নিরাপদে বার্থিং করতে না পারায় নতুন করে এলএনজি খালাসও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফলে মহেশখালীর দুই টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে না পারায় চট্টগ্রামের শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া এবং টার্মিনালগুলোর কারিগরি ত্রুটি কাটিয়ে সরবরাহ বাড়ানোই এখন সংকট নিরসনের প্রধান শর্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.