আপনি পড়ছেন

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে তেলের বিনিময়ে পণ্য আমদানির একটি গোপন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ইরান। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশটি চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম, ওষুধ ও যানবাহনের মতো শত কোটি ডলারের পণ্য সংগ্রহ করছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইরানের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্র।

নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেভাবে ইরানে পৌঁছাল চীনা পণ্য
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

সূত্রগুলোর মতে, এই বিশেষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে গত এক বছরে প্রায় ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলারের লেনদেন হয়েছে। এর আওতায় ইরানি তেলের মূল্যের বিপরীতে চীনা পণ্য আমদানির জন্য ঋণ সুবিধা বা ‘ক্রেডিট’ প্রদান করা হয়। পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই গোপন বাণিজ্য ব্যবস্থা তেহরানের জন্য একটি বড় আর্থিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে।

একই সঙ্গে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ চীন আন্তর্জাতিক নজরদারি ও শাস্তি এড়িয়ে স্বল্পমূল্যে ইরানি তেল সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছে। এতে করে যেসব চীনা ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান ইরানে পণ্য রপ্তানি করছে, তারাও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ থেকে রক্ষা পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল কেনা ও পরিবহনে জড়িত কয়েকটি ছোট চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় বড় ধরনের কোনো চরম পদক্ষেপ নেয়নি। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিরসন এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার চেষ্টার অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন চাপ আরও জোরদার করেছে। আগস্টে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বিভিন্ন দেশকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন না করলে তাদের ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে।

ছয় মাসের যুদ্ধের অংশ হিসেবে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে এই বিনিময় ব্যবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স। গত ১৪ জুলাই নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে চীনে কোনো ইরানি অপরিশোধিত তেলের চালান সফলভাবে পৌঁছাতে পারেনি বলে সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে।

চীন ও ইরান উভয় দেশই পশ্চিমাদের অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। দেশ দুটি দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদার হলেও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের মধ্যেও কীভাবে বাণিজ্য সচল রেখেছে, তা নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই তথ্য প্রকাশ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চীন থেকে ওষুধ, যানবাহন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয় করেছে ইরান। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করেনি এবং তারা কোনো নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

সূত্রগুলো আরও জানায়, ইরানের কাছে কয়েক মিলিয়ন ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তির ক্ষেত্রে গত এক বছরে অন্তত একবার এই প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে চীনা প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে এই লেনদেনের সুনির্দিষ্ট কোনো বিবরণ তারা দেয়নি এবং রয়টার্সও স্বাধীনভাবে এর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ার পর এবং তেহরান কিছু শর্ত মানা বন্ধ করার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের ওপর জাতিসংঘের প্রচলিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাসহ অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা পুনরায় কার্যকর হয়। তবে ‘স্ন্যাপব্যাক’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলোর এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পদক্ষেপকে ‘আইনগত ও পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছে ইরান ও চীন।

এই গোপন বিনিময় বাণিজ্যের বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত নয়।

মন্ত্রণালয়টির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক আইনের কোনো ভিত্তি নেই এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনহীন এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চীন সবসময়ই অবস্থান নিয়েছে।’

নিউইয়র্ক ও জেনেভায় ইরানের জাতিসংঘ মিশন এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

হোয়াইট হাউসের কাছে জানতে চাওয়া হলে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নেওয়ার উপাদানগত সক্ষমতা কেড়ে নিতে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ তাদের অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখিত ব্যবস্থা নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে চলা:

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল বিক্রির জন্য ইরানের কাছে খুব কম ক্রেতাই অবশিষ্ট রয়েছে। পণ্য তথ্য ও বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের মতে, ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনছে মূল ক্রেতা চীন, যার পরিমাণ ২০২৫ সালে দৈনিক গড়ে ১৪ লাখ ব্যারেল ছিল।

২০২১ সালে জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত করে একটি ২৫ বছর মেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে চীন ও ইরান। তবে সেই চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পণ্য ও সেবা কেনার যে কয়েকটি গোপন মাধ্যম ইরানের রয়েছে, এটি তার মধ্যে একটি বলে তিনটি সূত্র জানিয়েছে।

একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট আরও দুই ব্যক্তি জানান, অন্তত চলতি বছর পর্যন্ত চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান জুহাই ঝেনরং-এর পক্ষে একজন ক্রেতা প্রতি মাসে ‘চুশিন’ নামে পরিচিত চীনের একটি অজ্ঞাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শত কোটি ডলার জমা করতেন।

গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে ওই ব্যক্তিরা জানান, ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কিত হংকং-নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এই অর্থ জমা করা হতো। পরবর্তীতে চুশিন সেই অর্থ চীনা রপ্তানিকারক এবং ইরানে অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠিয়ে দিত।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.