আপনি পড়ছেন

সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। প্রকল্পের গাড়ি কেবল সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কাজেই ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের এই অনিয়মকে পারস্পরিক সুরক্ষা ও সুবিধা নেওয়ার যোগসাজশ হিসেবে দেখছেন দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞরা।

প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারে কর্মকর্তাদের নিয়ম ভাঙার হিড়িক
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সামনে রাখা প্রকল্পের বিভিন্ন গাড়ি

চার বছর আগে সুদমুক্ত সরকারি ঋণে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মনিরুল ইসলাম। গাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি মাসে তিনি সরকারিভাবে ৫০ হাজার টাকা ভাতাও নিচ্ছেন। অথচ ঋণে কেনা সেই গাড়ি নিজে ব্যবহার না করে তিনি চড়ছেন এলজিইডির একটি স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিক্যালে (এসইউভি বা জিপ)। গাড়িটির চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বহন করা হচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে।

মনিরুল ইসলামের ব্যবহৃত এই জিপটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজস’ প্রকল্পের। এমন বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় গাড়ি কিনে তা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তাদের ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছে এলজিইডি।

এসব গাড়ি ব্যবহারকারীদের তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ, বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছেও এলজিইডির গাড়ি রয়েছে।

নিয়মবহির্ভূতভাবে গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেন, তারা একা এই কাজ করছেন না। তবে বিদ্যমান সরকারি বিধিমালার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, প্রকল্পের গাড়ি কেবল প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কাজেই ব্যবহার করতে হবে এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষে তা কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দিতে হবে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, এলজিইডি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি দপ্তর। সংস্থাটির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করে পরিকল্পনা কমিশন এবং অনিয়মের অনুসন্ধান ও তদন্ত করে দুদক। ফলে এসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কর্মকর্তারা যখন এলজিইডির গাড়ি সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সুবিধা গ্রহণ ও একে অপরকে সুরক্ষা দেওয়ার অনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটি একটি যোগসাজশের অনিয়ম।’ এলজিইডি একটি সরকারি সংস্থা হিসেবে সরাসরি অনিয়মে জড়াচ্ছে এবং যারা গাড়িগুলো গ্রহণ করছেন তারাও সরকারি নিয়ম মানছেন না।

তিনি আরও বলেন, ‘এলজিইডি বিপুল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে এবং সংস্থাটির বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এমন একটি সংস্থার কর্মকর্তারা অন্য সংস্থার কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবহারের অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছেন—এমনটা মনে করা মোটেও অযৌক্তিক নয়।’

সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও গ্রামীণ হাটবাজারসহ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করে এলজিইডি। পরিকল্পনা কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটির আওতায় ১১৯টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চাহিদার অতিরিক্ত গাড়ি কেনার প্রবণতা পুরনো, যার ধারাবাহিকতায় এলজিইডি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় শত শত গাড়ি কিনেছে।

বর্তমানে এলজিইডিতে ঠিক কতটি প্রকল্পের গাড়ি রয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি, কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে সংস্থাটির ২৬১টি গাড়ির একটি তালিকা পাওয়া গেছে, যাতে গাড়িগুলোর ব্যবহারকারীদের বিবরণ রয়েছে।

প্রাপ্ত তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৬১টি গাড়ির মধ্যে ২১১টি জিপ, ৪১টি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং ৯টি কার রয়েছে।

তালিকার তথ্য অনুযায়ী, ২৬১টি গাড়ির মধ্যে ২১১টি গাড়ি ব্যবহার করছেন খোদ এলজিইডির কর্মকর্তারাই, যাদের অনেকেরই এমন গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকার বা যোগ্যতা নেই। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাকে ৫৯টি গাড়ি দিয়েছে এলজিইডি।

এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৬টি গাড়ি রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে রয়েছে আরও আটটি গাড়ি। অর্থাৎ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলিয়ে রয়েছে মোট ৩৪টি গাড়ি। পরিকল্পনা কমিশনে ১০টি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ছয়টি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনটি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তিনটি, বগুড়া সিটি করপোরেশনে দুটি এবং দুদকে একটি গাড়ি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বরাদ্দ করা তিনটি গাড়ির মধ্যে একটি পরিবহন পুলে স্ট্যান্ডবাই রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তালিকায় দেখা যায়, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ছয়টি গাড়ি প্রসিকিউটররা ব্যবহার করছেন বলে তালিকায় উল্লেখ আছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রসিকিউটররা কাজ করছেন এবং নিরাপত্তার কারণে তাদের গাড়ির প্রয়োজন হওয়ায় একটি সরকারি সংস্থা থেকে গাড়ি নেওয়া হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারকারীদের তালিকায় সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন। একইভাবে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, বিভাগীয় প্রধান, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবদের ক্ষেত্রেও এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে গাড়ি দেওয়ার কারণ, চালক ও জ্বালানি বাবদ বার্ষিক ব্যয় এবং গাড়িগুলো ফেরত আনার বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন জানান, পরিকল্পনা কমিশন ও দুদককে গাড়ি দেওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই। তবে মন্ত্রণালয়ে এলজিইডির কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তারা সংস্থাটির গাড়ি ব্যবহার করেন বলে তিনি দাবি করেন।

প্রথম আলো অবলম্বনে

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.