কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিরাপত্তা গবেষকদের পদত্যাগ এবং শীর্ষ প্রযুক্তি নির্বাহীদের সতর্কবার্তা স্বায়ত্তশাসিত এআই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাকে নতুন করে সামনে এনেছে। মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান যন্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব পৌঁছে গেছে কি না এবং এর পরবর্তী পরিণতি কী হতে পারে—তা নিয়েই এখন মূল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুপারইন্টেলিজেন্স নিয়ে বিজ্ঞানীদের শঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রতীকী ছবি

সম্প্রতি অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠানের এক গবেষক পদত্যাগ করার পর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। ওই গবেষক সতর্ক করে বলেন, ‘শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধিকারী সুপারইন্টেলিজেন্সের দিকে দ্রুত ছুটে চলছে এবং আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে।’ একই প্রতিষ্ঠানের আরেকজন গবেষক জানান, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতির পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ১০ শতাংশের বেশি।

এসব সতর্কবার্তার পর অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের গতি ধীর করার আহ্বান জানান। ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআই-এর প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক এই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে মার্কিন এআই খাতের গতি কমানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিকে চীনও এআইয়ের গতি কমানোর আহ্বানের বিরোধিতা করে সতর্ক করে জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভীতি ছড়ানো এবং বিরোধপূর্ণ মনোভাব প্রযুক্তি পরিচালনার বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সাধারণভাবে এই প্রযুক্তিকে বলা হয় আর্টিফিশিয়াল সুপারইন্টেলিজেন্স বা এএসআই। এ নিয়ে সর্বসম্মত কোনো সংজ্ঞা না থাকলেও গবেষকরা এটিকে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেন, যার বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে প্রতিভাবান মানুষের চেয়েও বেশি হবে। দার্শনিক নিক বোস্ট্রমের মতে, প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞানীয় দক্ষতাকে বহুলাংশে ছাড়িয়ে যাওয়া যে কোনো বুদ্ধিমত্তাই হলো সুপারইন্টেলিজেন্স।

বর্তমান চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের তুলনায় এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান মডেলগুলো লেখালেখি, কোডিং বা কিছু ক্ষেত্রে যুক্তিতর্কে মানুষকে ছাড়িয়ে গেলেও সেখানে মানুষের গভীর নজরদারি প্রয়োজন হয় এবং এগুলো সাধারণ ভুলও করে থাকে। তবে সুপারইন্টেলিজেন্স বলতে এমন ব্যবস্থাকে বোঝায়, যার কোনো মানবিক তদারকির প্রয়োজন হবে না। এটি মানুষের চেয়ে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কিংবা নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারবে।

বর্তমান উদ্বেগের মূল কারণ কেবল সুপারইন্টেলিজেন্স নয়, বরং সেখানে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি। গবেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় এআই ব্যবস্থা নিজেই পরবর্তী প্রজন্মের এআই নকশা ও প্রশিক্ষণ দিতে পারে। ফলে মানুষের পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনের সক্ষমতার চেয়েও দ্রুত গতিতে প্রযুক্তিটি এগিয়ে যেতে পারে। অ্যানথ্রপিক এবং ওপেনএআই উভয় প্রতিষ্ঠানই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জানিয়েছে, এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় আত্ম-উন্নয়ন তাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে ঘটছে।

ট্যুরিং পুরস্কার বিজয়ী ইয়োশুয়া বেনজিওর নেতৃত্বে এবং ৩০টিরও বেশি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শতাধিক বিশেষজ্ঞের সহায়তায় প্রস্তুতকৃত ‘২০২৬ ইন্টারন্যাশনাল এআই সেফটি রিপোর্ট’-এ বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতি তৈরির সক্ষমতা বর্তমান এআই ব্যবস্থার এখনও নেই। তবে স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করাসহ সংশ্লিষ্ট সক্ষমতাগুলো অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গবেষক ও নির্বাহীরা এর বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে প্রধান উদ্বেগ হলো প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ হারানো। কোনো ব্যবস্থা অতিমানবীয় যুক্তিবোধ অর্জন করলে পরিচালনাকারীদের পক্ষে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা বা বন্ধ করার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গবেষণাগারে থাকা পরীক্ষামূলক এআই এজেন্টগুলো তাদের সংরক্ষিত পরিবেশ ভেদ করে বাইরের নেটওয়ার্কে অনুমোদনহীন কোড কার্যকর করেছে।

আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো জীবাণু অস্ত্রের বিস্তার এবং সাইবার হামলা। উন্নত ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর দ্বিমুখী ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে, যার মাধ্যমে বিপজ্জনক পক্ষগুলো ক্ষতিকর জীবাণু তৈরি করতে পারে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর স্বয়ংক্রিয় বড় আকারের সাইবার আক্রমণ চালাতে পারে। এছাড়া ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাও রয়েছে। সুপারইন্টেলিজেন্সের হঠাৎ বিকাশ শ্রমবাজারকে বিপর্যস্ত করতে পারে, জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে এবং অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের হাতে বিপুল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা আগে এই প্রযুক্তি পেয়ে গেলে ‘একনায়কতান্ত্রিক দুঃস্বপ্ন’ নেমে আসতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন আমোদি।

তবে এই সক্ষমতার অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সমর্থকদের মতে, সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই রোগ নিরাময়, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের গতি বৃদ্ধি, নজিরবিহীন সমৃদ্ধি অর্জন এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মুখে শীর্ষ প্রযুক্তি নির্বাহীরা স্বেচ্ছায় এআইয়ের গতি কমানোর আহ্বান জানাতে শুরু করেছেন। শনিবার ‘উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার’ শিরোনামের এক প্রবন্ধে আমোদি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্বয়ংক্রিয় আত্ম-উন্নয়নের গতি বৃদ্ধি এবং একাধিক এআই এজেন্টের অনুমোদনহীন কার্যক্রমের কারণে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে নিরাপত্তা প্রস্তুতি পিছিয়ে পড়ছে।

এমনই একটি ঘটনা ঘটে জুলাই মাসে, যখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ওপেনএআই-এর পরীক্ষামূলক এআই মডেল তাদের নির্ধারিত সীমানা ভেঙে বেরিয়ে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাটি গোপন ত্রুটি খুঁজে বের করে নিজে থেকেই ইন্টারনেটে প্রবেশ করে এবং এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের সিস্টেমে প্রবেশ করে বেশ কয়েক দিন ধরে তথ্য খোঁজার চেষ্টা চালায়।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.