কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির শক্তিশালী মডেলগুলোর বিকাশের গতি কিছুটা কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদে। তার এই আহ্বানের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এতে বিশ্বের শীর্ষ দুই এআই পরাশক্তির পক্ষে প্রযুক্তিটির সুরক্ষা নিশ্চিতে একসঙ্গে কাজ করা কতটা কঠিন, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এআই বিকাশের গতি কমানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পতাকা

চলতি মাসে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে আমোদে যুক্তি তুলে ধরেন, এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি গবেষকদের বোঝার ও নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে। কারণ, এসব সিস্টেম এখন নিজেদের পরবর্তী সংস্করণ তৈরিতেও সাহায্য করতে সক্ষম হয়ে উঠছে।

প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমাতে হবে। অগ্রগতি তবুও দ্রুতই মনে হবে এবং অর্জিত এই সময়ের আমাদের বিচক্ষণ ব্যবহার করতে হবে।’

তার প্রস্তাবে শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীন মূল্যায়নকারী যুক্ত করা, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকার ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং পরবর্তীতে ফ্রন্টিয়ার এআইয়ের বিকাশের গতি পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি করার কথা বলা হয়েছে।

ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান, গুগল ডিপমাইন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস এবং স্পেসএক্সএআইয়ের ইলন মাস্ক প্রকাশ্যে আমোদের প্রস্তাবের কিছু বিষয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা এআই কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের এমন ঐকমত্য বিরল ঘটনা।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এ ধরনের পরিকল্পনা দ্রুতই একটি ভূরাজনৈতিক সমস্যার মুখে পড়ে, আর সেটি হলো চীন।

ওয়াশিংটনের ইচ্ছাকৃতভাবে এআইয়ের গতি মন্থর করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। তিনি এই বিষয়টিকে মূলত বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন। রবিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা এআই প্রযুক্তিতে চীনের চেয়ে এগিয়ে আছি। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক দেশ এবং খোলামেলাভাবে বলতে গেলে, আমি এভাবেই বজায় রাখতে চাই। কারণ, যে এআই জিতবে, তারই জয় হবে।’

সোমবার ট্রাম্প তার সমালোচনা আরও জোরালো করে প্রশ্ন তোলেন, কেন শিল্প নেতারা এমন নিয়ম চাইবেন যা তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বাধাগ্রস্ত করতে পারে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘বাণিজ্যের ইতিহাসে কবে এমন দেখা গেছে যে কোনো একটি খাতের নেতারা এমন নীতিমালার আহ্বান জানাচ্ছেন, যা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে তারা নিজেরাই হারিয়ে যাবে ও দেউলিয়া হয়ে পড়বে?’

এআই ও ডেটা সেন্টারের বিরোধিতাকে একটি ‘অসুস্থ ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি আরও বলেন, ‘এতে একমাত্র খুশি হচ্ছে চীন।’

আমোদে নিজেও এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চীনের ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন মন্থর করা হলে বেইজিং চূড়ান্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা পেয়ে যেতে পারে।

তিনি লিখেছেন, বৈশ্বিক গতি নির্ধারণে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যে কোনো চুক্তির জন্য ‘কঠোর যাচাইযোগ্যতা’ বা পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে গোপনে নিয়ম ভেঙে কোনো এক পক্ষ সম্ভাব্য চূড়ান্ত সামরিক সুবিধা অর্জন করতে না পারে।

মার্কিন প্রযুক্তি নেতাদের এমন সতর্কবার্তার বিষয়ে চীন সংশয় প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে চীনে উন্নত চিপ এবং সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর ওয়াশিংটনের বিধিনিষেধ বজায় রাখা সংক্রান্ত আমোদের যুক্তির কড়া জবাব দিয়েছে দেশটি।

সোমবার চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘ভীতি ছড়ানো, সংঘাত ও অশুভ প্রতিযোগিতা বিশ্বব্যাপী সুদৃঢ় এআই পরিচালনার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করবে, যা কারও স্বার্থ রক্ষা করে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য এআই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। সবার ভালোর জন্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উপায়ে এআইয়ের মুক্ত বিকাশ ঘটাতে সব পক্ষের যৌথভাবে কাজ করা উচিত।’

চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস একটি মতামত নিবন্ধে আমোদের প্রস্তাবকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখার একটি অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছে। পত্রিকাটি বলেছে, ‘এই নিভৃত এআই স্নায়ুযুদ্ধ চরম ভণ্ডামি ও অদূরদর্শী চিন্তাপ্রসূত।’ পত্রিকাটি আরও দাবি করে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে চীনকে সীমিত করার এবং বৈশ্বিক এআই পরিচালনা ব্যবস্থা থেকে বেইজিংকে দূরে রাখার অপচেষ্টা চলছে।

এই বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা ফুটিয়ে তোলে। ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে, নিজেদের রাশ টানলে চীন তাদের ছাড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে বেইজিং সন্দেহ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের এআই নিরাপত্তা প্রস্তাবগুলো চীনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে ফ্রন্টিয়ার এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্র সামগ্রিক নেতৃত্ব ধরে রাখলেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমিয়ে আনছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই এমন বিতর্ক শুরু হলো।

খাতভিত্তিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, সর্বাধুনিক চিপ সংগ্রহের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ডিপসিক, মুনশট এআই, জেড.এআই এবং আলিবাবার মতো চীনা ডেভেলপাররা ক্রমবর্ধমানভাবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ মডেল তৈরি করে চলেছে।

তা সত্ত্বেও চীনা গবেষকরা মনে করেন, সর্বাধুনিক এআই সক্ষমতার দিক থেকে মার্কিন গবেষণাগারগুলো এখনো এগিয়ে রয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে অক্সফোর্ড চায়না পলিসি ল্যাবের গবেষক জিলান কিয়ান জানান, যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের অগ্রগতি আরও দ্রুত ও অগ্রগামী হচ্ছে, ফলে চীনের চেয়ে মার্কিন গবেষণাগারগুলোতে গবেষকরা বেশি বিপজ্জনক বিষয় দেখতে পেতে পারেন।

চীন নিজেও ক্রমশ এআইয়ের ঝুঁকি স্বীকার করছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রযুক্তিটির ‘নিয়ন্ত্রণ হারানো’ রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে চীনা নিয়ন্ত্রক সংস্থাও দেশের এআই নিরাপত্তা কাঠামোতে এসব উদ্বেগকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

তবে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য বেইজিং এআইকে একটি কৌশলগত প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের চীন বিষয়ক ফেলো কেন্টন থিবো বলেন, এআই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উদ্বেগের কিছু মিল থাকা সত্ত্বেও এখনো উল্লেখযোগ্য বাধা রয়ে গেছে। বেইজিংয়ের আশঙ্কা, ওয়াশিংটন প্রযুক্তিগত উত্থান ঠেকাতে নিরাপত্তাবিষয়ক আলোচনাকে ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে কোনো চুক্তি কার্যকরভাবে বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.