সচিবালয়ের নিরাপত্তায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৯ দফা নির্দেশনা
বাংলাদেশ সচিবালয়ের সামগ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নয় দফা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের তদবির ও চাপের কারণে সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতির মুখে সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশ, গাড়ি চলাচল এবং রাতে অবস্থান সীমিত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয় থেকেই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে দেশের প্রধান এই প্রশাসনিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রত্যাশা অনুযায়ী কঠোর ছিল না। ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের কাছে এই নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে।
সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যখন কোনো সংসদ সদস্য একই গাড়িতে পাঁচ থেকে সাতজনকে নিয়ে আসেন, তখন তাদের সামলানো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি কিছু সংসদ সদস্য অসদাচরণও করেন।’
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রভাবশালী মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর থেকে ফটকে ফোন করে দর্শনার্থীদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে বললে পুলিশ সদস্যরা তা মানতে বাধ্য হন। এদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পুলিশের কয়েকজন অধস্তন সদস্য টাকার বিনিময়ে কিছু দর্শনার্থীকে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ করে দেন।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে গত ৪ অক্টোবর একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অন্তত পাঁচজন সিনিয়র সচিব ও সচিব ছাড়াও পুলিশের মহাপরিদর্শক উপস্থিত ছিলেন।
এক কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা সচিবালয়ের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অসন্তোষজনক বলে অভিহিত করেন। রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সচিবালয়ে প্রবেশের নিয়মকানুন ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করায় তারা বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরপরই সরকার দর্শনার্থীদের প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়।
নিরাপত্তা জোরদার করতে মন্ত্রিসভা সচিবের সই করা বৈঠকের কার্যবিবরণীতে মঙ্গলবার নয়টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়।
প্রথম নির্দেশনায় বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর অবস্থিত ১ নম্বর ভবনে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ‘অ্যাক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেম’ বা নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ব্যবস্থা চালু করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যরা নিজস্ব যানবাহনে সচিবালয়ে প্রবেশের সময় তাদের সঙ্গে কেবল ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও চালক থাকার অনুমতি পাবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও অনুমোদন যথাযথভাবে যাচাই করার পরই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
তৃতীয়ত, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ যানবাহন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বিশেষ স্টিকার চালু করতে হবে। অনুমোদিত পার্কিং স্টিকার ছাড়া কোনো যানবাহন সচিবালয় প্রাঙ্গণে পার্কিং বা অবস্থান করতে পারবে না।
চতুর্থ নির্দেশনায় বলা হয়, সচিবালয় প্রাঙ্গণে যানবাহনের প্রবেশ, চলাচল ও পার্কিং সংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা কর্তব্যরত পুলিশ নিয়মিত তদারকি করবে এবং কোনো ব্যত্যয় ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
পঞ্চম নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সচিবালয়ে আগত দর্শনার্থীদের গতিবিধি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে পুলিশ।
ষষ্ঠত, কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা অননুমোদিত ব্যক্তি রাতে সচিবালয় প্রাঙ্গণে অবস্থান করতে পারবেন না। বিশেষ পরিস্থিতিতে রাতে অবস্থানের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে।
সপ্তম নির্দেশনায় বলা হয়, সচিবালয়ে আগত বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য একটি পৃথক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি প্রাঙ্গণের ভেতরে তাদের গন্তব্য এবং প্রস্থানের সময় সংক্রান্ত তথ্য লিপিবদ্ধ রাখতে হবে।
অষ্টম নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীগণ সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ১০টি দর্শনার্থী পাস ইস্যু করতে পারবেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং অন্যান্য সচিবরা দিনে সর্বোচ্চ পাঁচটি, অতিরিক্ত সচিবরা সর্বোচ্চ তিনটি এবং যুগ্ম সচিবরা সর্বোচ্চ দুটি পাস ইস্যু করতে পারবেন। দুপুর ১২টার আগে দর্শনার্থী পাস ব্যবহার করে কাউকে সচিবালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
সর্বশেষ নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়, কোনো কর্মকর্তার বদলির আদেশ কার্যকর হওয়ার সাত দিন পর তার স্থায়ী পাসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব নির্দেশনা কবে থেকে পুরোপুরি কার্যকর হবে সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নির্দেশনাগুলো প্রশংসনীয়, তবে অতীতেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে সেগুলো বাস্তবায়নে খুব কম উদ্যোগই চোখে পড়েছে।’
ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা, যিনি বর্তমানে দলীয় কোনো পদে নেই, দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সচিবালয়ের সাবেক কর্মকর্তাদের জন্য হাজার হাজার অস্থায়ী পাস ইস্যু করা হয়েছে। তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তদবির এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের চেষ্টাসহ নানা উদ্দেশ্যে সচিবালয়ে ঢোকেন। এ বিষয়ে কি কোনো নির্দেশনা আছে?’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা থাকবে না, কারণ চাকরি ছাড়ার পরও কর্মকর্তারা সচিবালয়কে ঘিরে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা সেখানে ঢুকলে তাদের সমস্যা হবে!’
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.