আপনি পড়ছেন

মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে নাগরিকদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে জিম্বাবুয়ে সরকার। তবে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও মুদ্রাগত অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটির অনেকেই সরকারের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপে আস্থা রাখতে পারছেন না। স্থানীয় মুদ্রার ওপর জনগণের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ‘জিম্বাবুয়ে গোল্ড’ (জেডআইজি বা জিগ) নামের নতুন মুদ্রা চালু করা হয়।

ডলারের বিকল্প হতে পারবে কি জিম্বাবুয়ের ‘জিগ
জিম্বাবুয়ের নতুন মুদ্রা জেডআইজির ব্যাংক নোট

রিজার্ভ ব্যাংক অব জিম্বাবুয়ে (আরবিজেড) বলেছে, এই মুদ্রার বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা এবং স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর রিজার্ভ রাখা হয়েছে। তবে নতুন মুদ্রা চালু কিংবা এর রিজার্ভ সমৃদ্ধ করার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনগণের বিশ্বাস ফেরানো। অতীতে বারবার মুদ্রা সংকটের মুখে পড়ে যারা নিজেদের সঞ্চয় হারিয়েছেন এবং যাদের প্রকৃত আয় কমে গেছে, তারা ক্রয়ক্ষমতা হারানোর ভয়ে এই নতুন মুদ্রায় অর্থ ধরে রাখতে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

তীব্র মূল্যস্ফীতির কারণে ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ে তাদের স্থানীয় মুদ্রা বাতিল করে মার্কিন ডলারের আধিপত্যে একটি বহু-মুদ্রা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে আবার নিজস্ব মুদ্রা চালু করা হলেও ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতার কারণে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক চার্লস এমবওয়ান্দারিকওয়ার জন্য অতীতের সেই আর্থিক বিপর্যয় এখনও এক সতর্কবার্তা। তিনি তার বেতনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জেডআইজিতে পান এবং তা জমিয়ে না রেখে খুব দ্রুত ডলারে রূপান্তর করে নেন। জিম্বাবুয়ের আগের মুদ্রা যখন মুখ থুবড়ে পড়েছিল, সে সময় যে আর্থিক ক্ষতির মুখে তিনি পড়েছিলেন, তা থেকেই তার মনে এই সতর্কতা কাজ করে।

২০০৯ সালের সংকটের সময় তিনি পেনশনের সমস্ত সঞ্চয় হারিয়েছিলেন। তিনি জানান, ২০১৮ সালে যখন আবার স্থানীয় মুদ্রা পুনরায় চালু করা হয়, তখন বছরের শেষ নাগাদ তার বেতনের মান সমপরিমাণ ৫৪০ ডলার থেকে কমে মাত্র ৪০ ডলারে নেমে আসে। এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতাই তুলে ধরে যে কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক আশ্বাস সত্ত্বেও সাধারণ উপার্জনকারীদের মধ্যে কেন নতুন মুদ্রা নিয়ে আস্থা তৈরি হচ্ছে না।

মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৭ এপ্রিল আরবিজেড নতুন নকশা ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যযুক্ত উন্নত সিরিজের জেডআইজি ব্যাংক নোট বাজারে আনে। পোশাক বিক্রেতা সেসেদজাই চিগুমিরা জানান, তিনি জেডআইজি মুদ্রায় হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন, যা মার্কিন ডলারের প্রতি স্থানীয়দের স্থায়ী পছন্দের বিষয়টি স্পষ্ট করে।

আরবিজেডের তথ্য অনুযায়ী, আগের মাসে জেডআইজির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে তুলনামূলকভাবে কম মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও মানুষ এই মুদ্রায় সঞ্চয় করতে বা দৈনন্দিন কেনাকাটায় তা ব্যবহারে আগ্রহী হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অর্থনীতিবিদ কর্নেলিয়াস দুবে বলেন, জেডআইজির চাহিদা এখনো বেশ দুর্বল। তিনি বলেন, ‘চাহিদার অনুপাতের ওপর ভিত্তি করে বাজারে জেডআইজির সরবরাহ থাকতে হবে। বর্তমানে জেডআইজির চাহিদা খুবই কম।’

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কাছে কোনো মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা কতটা রয়েছে, তা থেকেই প্রমাণিত হয় সামগ্রিক অর্থনীতিতে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা। চিগুমিরার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই যেখানে মার্কিন ডলারে লেনদেন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সেখানে একটি নতুন মুদ্রার ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।

ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সরকারি পদক্ষেপে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কেবল সোনা বা অন্যান্য খনিজ সম্পদের মজুত থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি মুদ্রার ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হয় না। জনগণকে বিশ্বাস করতে হবে যে মুদ্রাটির মান ভবিষ্যতে বজায় থাকবে এবং পণ্য কেনাকাটা, দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ব্যবসায়ীরা যখন ধরে নেন যে গ্রাহকরা ডলারে অর্থ পরিশোধ পছন্দ করবেন, তখন তারা জেডআইজিতে পণ্যের দাম নির্ধারণ বা তা গ্রহণ করতে অনাগ্রহী হন। একইভাবে স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যেতে পারে—এমন শঙ্কায় সাধারণ ভোক্তারাও তা নিজেদের কাছে রাখার কোনো উৎসাহ পান না। ফলে একটি জটিল চক্র তৈরি হয়, যা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে ভাঙা সম্ভব নয়।

আরবিজেড ২০৩০ সালের মধ্যে একক মুদ্রায় ফিরে যাওয়ার আগের লক্ষ্যমাত্রা থেকে সরে এসেছে। এর পরিবর্তে তারা জেডআইজির বৃহত্তর ব্যবহারের লক্ষ্যে ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। এই কৌশলটি দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং এমন অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর নির্ভর করছে, যাতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা স্বেচ্ছায় এই মুদ্রা ব্যবহার করেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা ও জাতীয় লেনদেন সংক্রান্ত পদক্ষেপের পাশাপাশি কর পরিশোধ এবং সরকারি খাতের লেনদেনে ব্যবহারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে জেডআইজির ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তবে অর্থপ্রদানে কোনো মুদ্রার ব্যাপক ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে এটি দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়ের বাহন হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। নিরুপায় হলে মানুষ হয়তো জেডআইজি দিয়ে লেনদেন সম্পন্ন করবে, কিন্তু নিজেদের সঞ্চয় এই মুদ্রায় রাখতে আগ্রহী হবে না।

এমবওয়ান্দারিকওয়ার কাছে পেনশন সঞ্চয় হারানোর স্মৃতি এখনো অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। অন্যদিকে চিগুমিরার প্রতিষ্ঠানে জেডআইজিতে সীমিত কেনাবেচা প্রমাণ করে যে দৈনন্দিন বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে এই মুদ্রার এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

অর্থনীতিবিদ দুবে বলেন, অর্থনীতি থেকে ডলারের আধিপত্য দূর করা সম্ভব হলেও তা রাতারাতি অর্জন করা যায় না। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস বলে ডলারের নির্ভরতা কমানো সম্ভব, তবে তা সহজ নয়। এতে সময় লাগে।’

বারবার মুদ্রা সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া জিম্বাবুয়েনদের কাছে মূল বিষয় হলো জেডআইজি সময়ের সাথে সাথে তাদের আয় ও সঞ্চয়ের মূল্য ধরে রাখতে পারছে কিনা। নীতিমালার মাধ্যমে মুদ্রার প্রচলন হয়তো বাড়ানো যায়, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা।

দুবে বলেন, ‘নীতিমালার মাধ্যমে কাউকে জোর করে মুদ্রা রূপান্তরে বাধ্য করা উচিত নয়, বরং এমন প্রণোদনা তৈরি করতে হবে যাতে ব্যবসায়ীরা এবং ভোক্তারা জেডআইজি বা মার্কিন ডলার রাখার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য না দেখেন।’

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.