ক্ষমতা বদলালেও ফিলিস্তিন নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই ইসরায়েলে
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান স্বীকৃতি এবং গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার বিষয়ে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন সত্ত্বেও দেশটির আসন্ন নির্বাচনে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার বিরোধিতাই দলগুলোর মূল প্রচারণায় পরিণত হয়েছে। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে অংশ নেওয়া শীর্ষ প্রার্থীরা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা নাকচ করার পাশাপাশি সেখানে আরও সামরিক অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার উগ্র-ডানপন্থী জোটের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী নেতারাও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ঘোর বিরোধিতা করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে নেতানিয়াহুর জায়গায় অন্য কেউ ক্ষমতায় এলেও ফিলিস্তিনে দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং ফিলিস্তিনিদের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করার নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। বিরোধী দলগুলো গাজার বর্বরোচিত ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারার ব্যর্থতার জন্যই নেতানিয়াহুর বেশি সমালোচনা করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল, অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ওই অঞ্চলের শাসনভার নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব বজায় রাখার প্রশ্নে তাদের অবস্থান প্রায় একই।
গত ১৪ অক্টোবরের একটি জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিরোধীদের চারটি সমন্বিত জোট ৫০টি এবং নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের দলগুলো ৪৭টি আসন পেতে পারে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষই এককভাবে পাচ্ছে না। গাজা, বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিনিদের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে মূল দলগুলোর অবস্থান তুলে ধরা হলো:
লিকুদ: রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সরকার গঠন করে। তাদের নেতৃত্বেই পরিচালিত সামরিক অভিযানে গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধপদ্ধতি হিসেবে অনাহারকে বেছে নেওয়াসহ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
তা সত্ত্বেও এই দলটি জরিপে ১৮টি সম্ভাব্য আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। গাজা প্রসঙ্গে নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরায়েলি বাহিনী তাদের দখলদারিত্ব শেষ করার আগে হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে। লিকুদ পার্টি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে একটি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করে এবং বিরোধী দলগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে তা সমর্থনের অভিযোগ তোলে।
তাদের সরকার দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের গতি বাড়িয়েছে। দলটির মন্ত্রীরা এই নির্মাণকাজকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঠেকানোর হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করছেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ওপর দখলদারদের সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দখলদারদের রেকর্ড সহিংসতার অভিযোগকে কেবল ‘কিছু তরুণ অপরাধীর অপকর্ম’ বলে উড়িয়ে দেন।
রিলিজিয়াস জায়োনিজিম: ভূখণ্ড দখল ও বসতি সম্প্রসারণ
অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন উগ্র-ডানপন্থী দল রিলিজিয়াস জায়োনিজিম জরিপে ৬টি আসন পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা আবারও নেতানিয়াহুকে সরকার গঠনে সহায়তা করতে পারে।
সেপ্টেম্বরের এক পডকাস্টে স্মোট্রিচ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ভেঙে দেওয়া এবং গাজার মতো নৃশংস যুদ্ধ পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা গাজায় যা করেছি, সেখানেও তা-ই করা উচিত।’
তিনি গাজায় ইসরায়েলের দখল করা ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার দাবিও জানান। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উপস্থাপিত এক প্রস্তাবের আওতায় পশ্চিম তীরের প্রায় ৮২ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ফিলিস্তিনিরা একটি সংযুক্ত রাষ্ট্রের পরিবর্তে বিচ্ছিন্ন কিছু অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে স্থায়ীভাবে নস্যাৎ করা।
জিউইশ পাওয়ার: গণবাস্তুচ্যুতিকে ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ হিসেবে উপস্থাপন
জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভীরের দল জিউইশ পাওয়ার জরিপে আটটি সম্ভাব্য আসন পেয়েছে।
সেপ্টেম্বরে এক নির্বাচনী সংবাদ সম্মেলনে বেন-গভীর তথাকথিত ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ কৌশলের মাধ্যমে আগামী সাত বছরে গাজা থেকে ১৮ লাখ ৬০ হাজার ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার একটি নীলনকশা তুলে ধরেন। ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে তিনি গাজায় আবারও ইসরায়েলি বসতি ফিরিয়ে আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তিনি ফিলিস্তিনি বন্দিদের খাবার কমিয়ে দেওয়ার মতো চরম পদক্ষেপের পক্ষেও যুক্তি তুলে ধরেন। ২০২৬ সালের আগস্টে তিনি গাজায় প্রতি রাতে ইসরায়েলি বাহিনীকে ‘৩০ থেকে ৪০ জন’ মানুষকে হত্যার আহ্বান জানান এবং পুরো গাজা ইসরায়েলের অংশ বলে ঘোষণা করেন।
ইয়াশার: আইজেনকোটের ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্ব প্রত্যাখ্যান
ইসরায়েলের সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের দল ইয়াশার জরিপে ২০টি সম্ভাব্য আসন নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, যা তাকে বিরোধী জোটের সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে।
বৃহস্পতিবার গাজা সীমান্তের কাছে দেওয়া বক্তব্যে আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ১৮ মাসের মধ্যে হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রূপরেখা কিংবা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের কথা জানান, যা ওই অঞ্চলে পরবর্তী সামরিক অভিযানের আশঙ্কা জিইয়ে রেখেছে।
১১ অক্টোবর এক পডকাস্টে আইজেনকোট দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘দুই জাতির জন্য দুই রাষ্ট্র নীতি একটি ভুল।’ একই সঙ্গে তিনি শক্তিশালী ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার যুক্তি দেখিয়ে ইসরায়েলে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে অন্তর্ভুক্ত করারও বিরোধিতা করেন।
টুগেদার: বেনেট ও লাপিদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বিরোধিতা
সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিদের জোট ‘টুগেদার’ জরিপে ১২টি সম্ভাব্য আসন পেয়েছে এবং বিরোধী জোটে তারা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও নিকট ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ঘোর বিরোধী তারা দুজনই।
বেনেট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে লাপিড দীর্ঘমেয়াদে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের কথা বললেও অবৈধ দখলদার বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিষয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.