আপনি পড়ছেন

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশটিতে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরে সরাসরি মার্কিন জনগণের উদ্দেশ্যে প্রচার চালাচ্ছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং মার্কিন অর্থনীতিতে নেমে আসা বিপর্যয়ের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসছে তেহরান। দেশটির নীতিপ্রণেতারা বর্তমান যুদ্ধনীতি ও লাগামহীন সামরিক ব্যয়ের তীব্র সমালোচনা করে মার্কিন ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।

মার্কিন নির্বাচন: যুদ্ধের চড়া মূল্য সামনে আনছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রে একটি গ্যাস স্টেশনে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির তালিকা

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিবন্ধগুলোতে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মার্কিন অর্থনীতির ওপর এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ক্রমবর্ধমান যুদ্ধব্যয় ও সামরিক বরাদ্দ নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সরাসরি নিশানা করছেন।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র নন-রেসিডেন্ট ফেলো সিনা টুসি জানান, তেহরান মূলত সরাসরি আমেরিকান জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

আল জাজিরাকে টুসি বলেন, ‘তারা ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতায় আনতে চাইছে কিংবা মার্কিন রাজনীতিকে নির্দিষ্ট কোনো পথে পরিচালিত করতে চাইছে—বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। বরং তাদের মূল লক্ষ্য হলো এই যুদ্ধ নিয়ে সার্বিক ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা এবং তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য ও প্রচারণা জোরালোভাবে ছড়িয়ে দেওয়া।’

আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে। তবে যুদ্ধের বিরোধিতাকারী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কংগ্রেসের নির্বাচনী লড়াইয়ে টেক্সাসের মতো দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ঘাঁটিতেও এবার রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর শেয়ার করেন গালিবাফ, যেখানে আগের মাসে মার্কিন মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এর সঙ্গে মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে নেতিবাচক বিভিন্ন খবরের শিরোনামের একটি কোলাজও জুড়ে দেন তিনি।

পোস্টটিতে ‘রোড রানার’ কার্টুনের একটি চিত্র ব্যবহার করা হয়, যাতে দেখা যায় ওয়াইল ই কোয়োট নিজের তৈরি অস্ত্র দিয়ে ভুলবশত নিজের ওপরই বড় পাথর ছুড়ে মারছে।

ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে উদ্দেশ্য করে এক বার্তায় গালিবাফ লেখেন, ‘চলুন শতাংশের খেলা খেলি। সম্ভাবনার দিক থেকে নয়, বরং বৃদ্ধির শতাংশ দিয়ে বিচার করা যাক।’

এর আগে জাতীয় ঋণ ও বন্ড বাজার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থনীতিকে ক্যাসিনোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বেসেন্ট। তিনি নিজেকে সেই জুয়ার আসরের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বলে দাবি করেন।

বেসেন্টের মন্তব্যের জবাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির তথ্য টেনে গালিবাফ বোঝাতে চেয়েছেন যে, মার্কিন অর্থমন্ত্রীর আত্মতুষ্টির দাবি সত্ত্বেও যুদ্ধের কারণে দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। কয়েক দিন আগেও তিনি ঘণ্টার মতো বাঁকানো একটি গ্রাফ শেয়ার করেন, যেখানে ডিজেলের চড়া দাম এবং আবাসন সক্ষমতা ও ভোক্তা আস্থার তীব্র পতনের চিত্র তুলে ধরা হয়।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় ইরান, যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড প্রতি গ্যালনে (৩ দশমিক ৮ লিটার) ৬ দশমিক ৩৩ ডলারে পৌঁছেছে এবং সাধারণ জ্বালানির দাম বেড়ে ৪ দশমিক ৩৩ ডলার হয়েছে, যা যুদ্ধের আগে ৩ ডলারেরও কম ছিল।

হরমুজ প্রণালী ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা বারবার দাবি করার পর, সাম্প্রতিক সময়ে ওই জলসীমায় জাহাজের ওপর হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে ইরান।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ট্রাম্প যখন সুদের হার কমানোর দাবি জানাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই নীতিগত সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয় মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ।

এদিকে ২৯ সেপ্টেম্বর আমেরিকান জনগণের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক চিঠিতে যুদ্ধের খরচ ও মার্কিন অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ তোলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তেলের দাম খুব দ্রুত কমে যাবে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছিলেন, তাও উড়িয়ে দেয় তারা।

আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়, মার্কিন অর্থনীতির ওপর বিশ্বের দেশগুলো আস্থা হারিয়ে ফেলেছে এবং আমেরিকান বন্ডের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বাস্তবে বিভিন্ন দেশ এখন তাদের হাতে থাকা মার্কিন বন্ড বিক্রি করতে শুরু করেছে। চিঠিতে সতর্ক করে আরও বলা হয়, খুব শিগগিরই এই ব্যবস্থার পতন ঘটবে এবং অর্থনীতিতে তীব্র ধস নামবে, যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাধারণ আমেরিকানদের জন্য বহু বছর ধরে চরম ভোগান্তি বয়ে আনবে।

আমেরিকান জনগণের উদ্দেশ্যে আইআরজিসি আরও বলে, ‘আমেরিকানদের এখন জেগে ওঠার সময় এসেছে। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হাত থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে হবে। এখনই উপযুক্ত সময়, কারণ মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বর্তমানে তার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।’

এই সংঘাতের ক্ষেত্রে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে তা সম্ভাব্য নির্বাচনী ফলাফলের কারণে যতটা না, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করছে নির্বাচনের পর ট্রাম্প কী পদক্ষেপ নেবেন তার ওপর।

৩ নভেম্বরের আইনসভা নির্বাচনের পর ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাবেন অথবা আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরে যাবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এই নির্বাচন তার ইরান নীতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে—এমন সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমার অবস্থান কী হয় তা দেখার জন্য তারা অপেক্ষা করছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না যে আমি এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি না।’ ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘আমি এই নির্বাচনকে কোনো আমল দেইনি এবং দেবও না। ইরানের প্রসঙ্গ এলে নির্বাচনের চিন্তা আমার মাথায় আসেই না। আমার একমাত্র চিন্তা হলো, ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।’

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে সামরিক অভিযানের তহবিল আটকে দেওয়াসহ ট্রাম্পের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা খর্ব করতে তারা উদ্যোগ নিতে পারে। তবে নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয়ের সুফল নিয়ে খোদ ইরানের ভেতরেই ভিন্নমত রয়েছে বলে জানান টুসি। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদ থাকার কারণে নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন আসবে না বলে অনেকে মনে করলেও, অন্যদের মতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এলে তা সংঘাতের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.