আপনি পড়ছেন

নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত ২২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এবার পাসের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ইংরেজিতে দুর্বলতায় এইচএসসির ফলাফলে বড় ধস
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লোগো

প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, এবার মাত্র ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর এই পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট।

সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় পতন দেখা গেছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা গত বছর ছিল ৬৩ হাজার ২১৯ জন। ফলে এক বছরে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৭ হাজারের বেশি।

এবারের ফলাফলে বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে খারাপ ফলাফল। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ছাড়া প্রায় সব শিক্ষা বোর্ডেই এই বিষয়ে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আবশ্যিক এই বিষয়ে দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়ার অন্যতম মূল কারণ হতে পারে। এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে আবারও পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

ফলাফলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত তিন বছর ধরেই পাসের হার দ্রুত কমছে। ২০২৪ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে নেমে আসে, যা এক বছরে প্রায় ১৮ শতাংশ পয়েন্টের পতন। চলতি বছর তা আরও কমে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে দাঁড়াল।

চলতি বছরের খারাপ ফলাফলের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, প্রশ্নপত্রের কাঠামো এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতিসহ বেশ কয়েকটি বিষয় পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে ইংরেজির মতো আবশ্যিক বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মূল কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, প্রশ্নের কাঠিন্য, পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং খাতা মূল্যায়নের ধরন খতিয়ে দেখে আসল কারণ শনাক্ত করা প্রয়োজন।

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল ২৯ অক্টোবর প্রকাশের কথা ছিল। পরে সেই তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। এ বছর ২ জুলাই পরীক্ষা শুরু হয়। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন।

ফলাফলে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীদের পাসের হার বেশি। ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। ছাত্রদের অর্ধেকেরও বেশি অকৃতকার্য হয়েছে, অন্যদিকে ছাত্রীদের অকৃতকার্য হওয়ার হার ৪৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্ররা কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যে ১৮ হাজার ১৫৫ জন ছাত্র এবং ১৭ হাজার ৭৯৩ জন ছাত্রী।

২০০৫ সালে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। এ বছরও দলটি ক্ষমতায় রয়েছে। ২০০৫ থেকে এ বছর পর্যন্ত ২২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে পাসের হারে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছিল গত বছর। ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কোনো বছরই তা ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি। এ সময়ে পাসের হার ওঠানামা করলেও অধিকাংশ বছর ৬০ শতাংশের ওপরে ছিল এবং প্রায়ই ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত।

করোনা মহামারি শুরুর বছর ২০২০ সালে পরীক্ষা ছাড়াই ফলাফল প্রকাশের পর শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে গত দুই বছরের ধারাবাহিক পতনকে এইচএসসি পরীক্ষার সাম্প্রতিক ধারার এক বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এবারের ফলে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বল পারফরম্যান্স বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ড ছাড়া অন্য কোনো বোর্ডে বিষয়টিতে পাসের হার ৭০ শতাংশ বা তার বেশি হয়নি। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। সামগ্রিক পাসের হারের দিক থেকেও সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে ঢাকা বোর্ড শীর্ষে রয়েছে। অন্যান্য বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৫৪ থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশের মধ্যে। আগামী রবিবার থেকে এইচএসসি পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন নেওয়া শুরু হবে।

ইংরেজি আবশ্যিক বিষয় হওয়ায় এতে বিপুল শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া সামগ্রিক ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে। তবে ইংরেজিতে খারাপ ফলের পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের অপর্যাপ্ত প্রস্তুতিই দায়ী কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রাপ্যতা, শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখার পরিবেশ এবং পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন—সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রশ্নপত্র কঠিন ছিল কি না এবং আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার উত্তরপত্র বেশি কড়াকড়িভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে ভুল ও অসঙ্গতির নানা অভিযোগ উঠেছিল। সরকারও পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। এছাড়া রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রেও কিছু অসঙ্গতির অভিযোগ করেছিলেন পরীক্ষার্থীরা।

শুধু প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশনেই নয়, এবার প্রশ্নপত্র বিতরণেও ভুলের খবর পাওয়া গেছে। কিছু জায়গায় নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের অনিয়মিতদের জন্য নির্ধারিত প্রশ্ন দেওয়া হয়, আবার কোথাও প্রথম পত্রের জায়গায় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়। এসব ঘটনায় কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং তদন্তসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর পাশাপাশি প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল।

শিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আনা পরিবর্তনও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া প্রতিটি উপাদানের প্রভাব আলাদা করে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

ফলাফলের এই ধারাবাহিক অবনতি কেবল শিক্ষার্থী পাস বা ফেল করার বিষয় নয়, এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অর্জন এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করাই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে কতটা শিখছে, বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়ে তাদের মৌলিক দক্ষতার কতটা বিকাশ ঘটছে, তা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবারের ফলকে কেবল পাসের হার কমে যাওয়া হিসেবে না দেখে শিক্ষার মান মূল্যায়নের একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।

প্রথম আলো অবলম্বনে

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.