advertisement
আপনি পড়ছেন

আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'লা বলেন, "আর উপস্থিত করা হবে আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে অপরাধীদের তুমি দেখবে আতঙ্কগ্রস্ত এবং তারা বলবে হায়, দুর্ভাগ্য আমাদের! এ কেমন গ্রন্থ এ তো ছোট বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং তা সমস্ত হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম উপস্থিত পাবে; তোমার রব তো কারো প্রতি যুলুম করেন না ।" (সুরা কাহাফ ১৮: ৪৯)

amalnama the last trailসেদিন নেকীর পাল্লা ভারি হলে মিলবে জান্নাত আর বদির পাল্লা ভারি হলে মিলবে জাহান্নাম, প্রতীকী ছবি হিসেবে ব্যবহৃত

মানুষের জীবনের দুটি অংশ। তার দুনিয়ার জীবন তথা কর্মক্ষেত্র, আর তার আখিরাতের জীবন যেখানে তাকে তার কর্মের প্রতিদান দেয়া হবে। এই প্রতিদানকে নিখুঁত করার জন্য মহান আল্লাহ তা'লা বিভিন্ন ব্যবস্থা রেখেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হল আমলনামা। এতে মানব জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সমস্ত কিছুই রেকর্ড করা হচ্ছে। যারা দুনিয়ার জীবনে বেপরোয়া জীবনযাপন করেছে তারা এই আমলনামা হাতে পেয়ে আঁতকে উঠবে। কারণ এখানে সে তার সকল কৃতকর্ম উপস্থিত পাবে।

কিয়ামতের বিচার এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা ও জরুরত

কেন আমাদের বিচারের সম্মুখীন করা হবে? না করলে সমস্যা কি? বহু মানুষের এই প্রশ্ন। বহু মানুষ এই ব্যাপারে উদাসীন থাকতে চান। যেন চোখ বুজে থাকলে প্রলয় কেটে যাবে। তাই কি? মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের জীবনের জন্য যতগুলো ধাপ ঠিক করে দিয়েছেন তার কোনটা বাদ গেছে বলুন তো? মাতৃগর্ভে অবস্থান, জন্ম, শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন, বার্ধক্য, মৃত্যু একের পর এক ধাপ যথাসময়ে আসতে থাকে। কোনটিরও কি ব্যতিক্রম করা সম্ভব? আমরা যে যে বয়সে আছি, দেখি না আল্লাহর কোন ব্যবস্থা বাদ পড়েছে কিনা? বাকীগুলোই বা বাদ পড়বে কেন?

অতঃপর কথা হল এর প্রয়োজনীয়তা। আল্লাহ তা’লা নিজেই তা বলে দিয়েছেন-

“তাঁরই কাছে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তন। আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সৃষ্টিকে তিনিই প্রথম অস্তিত্বে আনেন, অতঃপর তার পুনরাবর্তন ঘটান যারা মুমিন ও সৎকর্মশীল তাদের ন্যায়বিচারের সাথে কর্মফল দেয়ার জন্য। আর যারা কাফির তারা কুফরি করতো বলে তাদের জন্য আছে ফুটন্ত পানি ও যন্ত্রনাদায়ক কঠিন শাস্তি।”

আখিরাত মানুষের নিজের জন্যই জরুরি। প্রতিটা মানুষ ভাল কাজের শুভ পরিণতি দেখতে চায় এবং মন্দ লোকদের শাস্তি হোক কামনা করে। কিন্তু দুনিয়ার জীবনে আমরা দেখি এর বিপরীত চিত্র। এখানে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ মানুষেরা নানা ধরনের কষ্টের শিকার আর চারিদিকে জালেম অত্যাচারীরা এখানে আছে আনন্দ উৎফুল্লতার মধ্যে। সৎ লোকেরা অর্থের অভাবে নানাভাবে জর্জরিত। অসৎরা অন্যায় পথে উপার্জিত সম্পদের পাহাড়ে বসে দান-দাক্ষিণ্য করে মানুষকে ধন্য করে।

এমনকি ধর্মীয় পরিমন্ডলের লোকেরা এদের পিছু পিছু ঘুরে, মসজিদ-মাদ্রাসা বানানোর জন্য, আরাম-আয়েশের সামান্য কিছু ভাগ যদি এরা নিজেরা পায় সেজন্য অথবা নিজের বা নিজের পিতা-মাতার হজ্জ-উমরা করার জন্য যদি কিছু পাওয়া যায় সে আশায়। জালিম দুর্নীতিবাজের সামনে হাত কচলানো চলছে অবিরাম। কখনো কখনো আল্লাহ এদের ও এদের দোসরদের পাকড়াও করেন। কিন্তু দুনিয়াটা তিনি সৃষ্টিই করেছেন নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে। কোটি কোটি মানুষের হত্যাকারী হিটলারকে ধরাই গেল না। ধরা গেল না তার বেশিরভাগ সাথীকেই। সবাই আত্মহত্যা করেছে। আর ধরতে পারলেই বা কি? তাদের যদি মৃত্যুদণ্ড হতো তবে তা একবারই।

আর যদি জেল হতো তাহলে মানুষের পয়সায় নিরুপদ্রব জীবন কাটানোর ব্যবস্থা পেয়ে গেল। তাই দুনিয়ার জীবনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার যথাযথ সুযোগ নেই। তা করলে তো আর দুনিয়ার জীবনের পরীক্ষাটাই থাকে না। অপরাধ করার সাথে সাথে যদি কারো জবান আটকে যায়, হাত-পা প্যারালাইসিস হয়ে যায় তাহলে তো কেউ আর অপরাধ করবে না। এটা মনে রাখা খুব জরুরি যে, দুনিয়ার জীবনটা পরীক্ষার স্থান-

“তিনি তোমাদের জন্য মৃত্যু ও জীবন নির্ধারণ করেছেন যেন তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন কে তোমাদের মধ্যে ভাল কাজ করে। ” (সুরা মূলক ৬৭:২)

পরীক্ষা অবসানেই ফলাফল লাভ হবে- নেককার, বদকার সবার। তাৎক্ষণিক পাকড়াওয়ের তাগিদ আমাদের অর্থাৎ মানুষদের। কারণ সব কিছুর তড়িৎ ফল দেখতে চাই। কিন্তু অপরাধের সুযোগ না থাকলে অপরাধীর অপরাধের প্রকৃত মাত্রা বুঝা যাবে কিভাবে? আবার তওবার সুযোগ না থাকলে মানুষ তার যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবেই বা কিভাবে? নিজেকে নিয়ে ভাবি। আমি কি চাই না আমার ভুল আর অন্যায়গুলো শুধরে নেয়ার সুযোগ থাকুক? তাহলে অপরের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে কেন? মানুষের তাড়াহুড়া করার আরেক কারণ মানুষ মরণশীল। জীবদ্দশায় এই পাপীদের কঠিন পরিণাম আমরা দেখতে চাই। এসব সমস্যা আল্লাহ তা’লার নেই। কেউ পালিয়ে তাঁর কাছ থেকে বাঁচতে পারবে না। মরে পার পেয়ে যাবে তা-ও হবে না।

দুনিয়ার জীবনের আরেক বাস্তবতা হল বিচার প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা। অপরাধী অনেক সময় ধরাই পড়ে না আবার অনেক সময় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যথাযথ প্রমাণ-পঞ্জির অভাবে সে পার পেয়ে যায়। এজন্য এই আমলনামার ব্যবস্থা।

আরো যত ব্যবস্থা

আমলনামার সাথে বিচার ব্যবস্থাকে পূর্ণতা দান ও নিখুঁত করার জন্য আল্লাহ তা’লা আরো কিছু ব্যবস্থা রেখেছেন:

(১) জমিনের সাক্ষ্য: মানুষ যেখানে বসে যে কাজ করে সেখানেই তার একটা রেকর্ড রাখা হচ্ছে।

আল্লাহ বলেন-

“সেই দিন পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, কারণ তার রব তাকে আদেশ করবেন।” (সুরা যিলযাল ৯৯ :৪-৫)

(২) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাক্ষ্য: শাস্তির ভয়াবহতা দেখে সেদিন মানুষ আমলনামা অস্বীকার করতে চাইবে। হাদিসে এসেছে, সে বলবে আজ আমার নিজের সাক্ষ্য ছাড়া আমি আর কারো সাক্ষ্য মানি না। তখন তার মুখ বা জবানটা বন্ধ করে দেয়া হবে। এবং তার হাত-পা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি তার কীর্তিকলাপের বয়ান উপস্থিত করবে-

“পরিশেষে যখন তারা জাহান্নামের নিকটে আসবে তখন তাদের কান, চোখ, ও চামড়া তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিবে তাদের বিরুদ্ধে।

জাহান্নামীরা তাদের জিজ্ঞাসা করবে তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন? উত্তরে তারা বলবে, আল্লাহ যিনি আমাদের বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি সমস্ত কিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তাঁরই কাছে তোমরা ফিরে যাবে।

তোমরা কিছুই গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কান, চোখ ও ত্বক তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে না- উপরন্তু তোমরা মনে করতে যে তোমরা যা করো তার অনেক কিছুই আল্লাহ জানেন না।” (হামীম আস-সাজদা ৪১ : ১৯-২২)

একই বিষয় এসেছে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে। সুরা নুর: ২৪ সেখানে জিহ্বার কথা এসেছে। যা দিয়ে অবিরাম মিথ্যাচার করা হয়, অন্যকে কষ্ট দেয়া হয়; সে সেদিন তার এই অপপ্রয়োগ তুলে ধরবে। সুরা ইয়াসীন যা অনেকে মুখস্ত পড়েন দিবারাত্র, সেখানে ৬৫ আয়াতে হাত ও পায়ের কথা এসেছে। কে কাকে তাদের কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা তারা তুলে ধরবে। কিভাবে দুর্নীতি আর ব্যভিচার, কিভাবে মজলুম মানুষকে অত্যাচার করতে - কোপাতে আর লাথি মারতে এসব ব্যবহার করা হয়েছে, তারা তুলে ধরবে তাদের মালিকের সামনে। কারণ তাদেরকে তো এসব কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। মানুষকে সীমিত সময়ের জন্য কেবল এগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আসলে আমরা কিছুরই মালিক নই। হায় কি ভয়াবহ! আমরা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিব। নিজেদের অপরাধের এই সাক্ষ্য থেকে বাঁচার তো কোন উপায় নেই।

একটা চিন্তাধারা হল- সিসি ক্যামেরার ফুটেজের স্ক্রিনে যখন কীর্তিকলাপগুলো দেখা যাবে তখন এমনি হাত-পায়ের সাক্ষ্য হয়ে যাবে। সেখানেই দেখা যাবে কে কি করেছে, কি বলেছে। হতে পারে, তবে আল্লাহ বলেছেন, তাদের বাকশক্তি দিবেন। সেভাবে চিন্তা করার মধ্যেও কোন পশ্চাদপদতা নেই। আমাদের মতই হবে এমন মনে করার কোন কারণ নেই। আল্লাহই জানেন কিভাবে হবে। তবে হবে সুনিশ্চিত।

(৩) নবী ও নেক লোকদের সাক্ষী:

সেই সাথে সাক্ষী দিবেন আম্বিয়া (আ.) ফিরিশতারা ও নেককার বান্দা-বান্দীরা-

"এইভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রসুল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হবে।" (বাকারা ২: ১৪৩)

এখানে সাক্ষ্য হওয়ার ব্যাপক ব্যাখ্যা রয়েছে। যা এখানে উল্লেখ সম্ভব নয়। এর মাঝে নিজের দায়িত্ব এবং অপরের কীর্তিকলাপের সাক্ষ্যও অন্তর্ভুক্ত। নবীরা এবং নেককাররা মানুষকে কিভাবে দাওয়াত দিয়েছেন এবং তারাই বা তার প্রতি কিভাবে রিঅ্যাক্ট করেছে সবই উঠে আসবে।

(৪) অন্তরের উদ্দেশ্য জানেন আল্লাহ তা'লা:

"আর জেনে রাখ আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যবর্তী হয়ে থাকেন।" (সুরা আনফাল ৮ : ২৪)

তিনি সেখানে অবস্থান করেন না বরং তার জ্ঞান মানুষের অন্তরের উদ্দেশ্যগুলি, চিন্তা-ভাবনা, আইনের পরিভাষায় যাকে বলে “Mens rea” তথা Intention জানেন একমাত্র মহান রব্বুল আ'লামীন। ফলে কে কি উদ্দেশ্য কোন কাজ করছে তা-ও সেদিন উপস্থিত করা হবে।

আল্লাহ বলেন-

"প্রত্যেক মানুষের কর্ম আমি তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব যা সে পাবে উন্মুক্ত। তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাব নিকাশের জন্য যথেষ্ট।" (বনী ইসরাঈল ১৭: ১৩-১৪ )

আমল চলছে, রেকর্ড হচ্ছে। আমলনামা যথাসময়ে উপস্থিত হবে। কাউকে দেয়া হবে ডানহাতে, সামনে হতে আর কাউকে বাম হাতে জোড়পূর্বক পেছন থেকে গুঁজে দেয়া হবে। আর সেদিন তো সে আর তা নিতে চাইবে না:

" সেইদিন উপস্থিত করা হবে তোমাদেরকে এবং তোমাদের কিছুই গোপন থাকবে না।

তখন যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে সে বলবে, নাও আমার আমলনামা পড়ে দেখ; আমি জানতাম যে আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে।

সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন।" (সুরা হাক্কা ৬৯ : ১৮-২১)

আর বিপরীত দিকে

"কিন্তু যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবে, হায়! আমাকে যদি দেয়াই না হতো আমার আমলনামা এবং আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব। হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো!
আমার ধনসম্পদ আমার কোনই কাজে আসল না।
আমার ক্ষমতাও বিনষ্ট হয়েছে।
ফিরিস্তাদের বলা হবে ধরো তাকে,
আর তার গলায় বেঁড়ি পড়িয়ে দাও।
অতঃপর তাকে নিক্ষেপ কর জাহান্নামে।
পুনরায় তাকে শৃংখলিত কর সত্তর হাত লম্বা এক শৃংখলে।
সে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিল না এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উৎসাহিত করতো না,
অতএব এইদিন তার কোন বন্ধু শুভাকাঙ্খী থাকবে না,
এবং কোন খাদ্য থাকবে না ক্ষত থেকে বের হওয়া পুঁজ ছাড়া,
যা অপরাধী ছাড়া কেউ খাবে না।”
( সুরা হাক্কাঃ ৬৯ : ২৫-৩৭)

এ এক আতঙ্ক জাগানিয়া বর্ণনা। যা আত্মাকে কাঁপিয়ে দেয়। শরীর শিউরে উঠে। এতটুকুনের মধ্যেই উপলব্ধির সমাপ্তি না ঘটুক। উঠি, আত্মাকে জাগরিত করি। নিজেকে এই কঠিন পরিণাম থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি জান-প্রাণ দিয়ে। কি দিয়ে আমলনামা ভরছি সবাই ভেবে দেখি। গুনাহ হয়ে গেছে? মাফ চাই, তাওবা করি। আমাদের রব বড়ই রহমদিল। মাফ করে দেয়ার ওয়াদা করেছেন। রমজান চলে যাচ্ছে, মাফির জন্য, তাওবার জন্য কাজে লাগাই। নেক আমলগুলো বেশী বেশী করি। নামায, ফিতরা, যাকাত, রোজার যত্ম নেই। নিজেকে বদলে দেই, বদলে ফেলি। মানুষ কি বলে চিন্তা করবেন না। কালকের সে দিনে কেউ আপনাকে আমাকে বাঁচাতে আসবে না। আল্লাহ সবাইকে রহম করুন, মাফ করে দিন।