advertisement
আপনি দেখছেন

চারদিকে কালো ধোঁয়ায় কোনো কিছু দেখা যাচ্ছিল না। মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে পুরো ভবনটি কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। তাই সেখান থেকে বের হয়ে আসা ছিল প্রায় অসম্ভব। এভাবেই সেই ভয়ার্ত মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দিচ্ছিলেন কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ২২ তলা ফারুক রূপায়ন টাওয়ারের ১৭ তলায় কাজ করা এক নারী।

banani fire 29 03 2019

আমরা নেটওয়ার্কস লিমিটেডের ক্রেডিট কন্ট্রোল ম্যানেজার পারভিন বলেন, ‘আমরা ওই সময় একটা বিভাগীয় সভায় ছিলাম। হঠাৎ জানালা দিয়ে দেখলাম অনেক কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে এবং খেয়াল করলাম আমাদের ভবনেই আগুন লেগেছে।‘

‘তাৎক্ষণিকভাবে আমি অন্য সহকর্মীদের সাথে অফিস থেকে বের হয়ে সিঁড়ির কাছে যাই। সেখানে আমরা অসংখ্য মানুষের আত্মচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম এবং সিঁড়িটি কালো ধোঁয়ায় ভরে ছিল’, যোগ করেন তিনি।

মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে পুরো ভবনটি ধোঁয়ায় ভরে যায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ছাদে চলে যাই। আমিসহ প্রায় ৫০ জনের মতো আমরা ছাদে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু ধোঁয়ার কারণে সেখানে বেশি সময় টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।’

সিঁড়িতে ধোঁয়া থাকায় অন্য সহকর্মীদের সাথে ছাদে চলে যান পারভিন। কিন্তু সেখানেও বেশি সময় থাকতে না পারায় তারা তাদের পাশের ভবন আহমেদ টাওয়ারে লাফিয়ে যান এবং কোনো রকমে নিচে নামতে সক্ষম হন।

পারভিন জানান, তিনি অনেককে ভবনের জানালা ভেঙে লাফ দিতে দেখেছেন। তাদের ছাদে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না বলে জানালা ভেঙে লাফ দিতে গিয়ে অনেকে নিচে পড়ে যান।

অগ্নিদগ্ধ এফআর টাওয়ার ভবনে আটকা পড়া মানুষগুলো দুটি উপায়ে বাঁচার চেষ্টা করেছেন- কেউ ছাদে গিয়েছেন এবং কেউ জানালা ভেঙে পাশের আহমেদ ভবনে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

আগুন লাগার পর মাত্র ১৫ মিনিট পর্যন্ত ছাদে যাওয়া সম্ভব ছিল অর্থাৎ বেলা ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে আগুন লাগার পর ১টার পর আর ছাদে যাওয়া সম্ভব ছিল না জানিয়ে পারভিন বলেন, এরপর সিঁড়িতে ধোঁয়ার পরিমাণ এতটাই ছিল যে আর যাওয়া সম্ভব ছিল না।

তিনি আরও জানান, তাদের ফ্লোরে ৬৫ জন কর্মী থাকলেও চারজন বের হতে পারেননি। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে তাদের উদ্ধার করে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করেন।

২২ তলা ভবনটিতে প্রায় দেড় ডজনেরও বেশি বিভিন্ন অফিস থাকলেও কোনো জরুরি নির্গমন পথ ছিল না জানিয়ে পারভিন বলেন, আমি এ ভবনে প্রায় সাত বছর ধরে কাজ করছি। কয়েক বছর আগে একটি ভূমিকম্পের সময়ও এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল.. তখনও আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে অনেকে আহত হয়েছিলেন।

অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুশান্ত রায় ইউএনবিকে বলেন, ‘স্রষ্টাকে ধন্যবাদ যে বেঁচে ফিরতে পেরেছি। আমি ১৭তম ফ্লোরে যখন আটকে পড়েছিলাম, ভেবেছিলাম, এটাই শেষ… আর হয়তো বেঁচে ফিরতে পারব না…। কালো ধোঁয়া ও অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে শ্বাসও নেয়া যাচ্ছিল না।’

‘আমরা জানালার কাঁচগুলো ভেঙে ফেলি এবং সহায়তার জন্য চিৎকার করতে থাকি। একবার ভেবেছিলাম লাফ দেব, তখনই অনেককে তার বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে পড়ে যেতে দেখলাম’, যোগ করেন তিনি।

সুশান্ত পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সহায়তায় মইয়ের সাহায্যে নিচে নামতে পেরেছিলেন কিন্তু অনেকেই তা পারেননি।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যেয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘এটি দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড। এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তারা যতই প্রভাবশালী, ক্ষমতাধর হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এফআর টাওয়ারটি নিয়ম লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে জানিয়ে গৃহায়ণমন্ত্রী বলেন, ‘১৮তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, কিন্তু অবৈধভাবে ভবনটি ২২তলা করা হয়।’

এক প্রশ্নের জবাবে রেজাউল করিম বলেন, ভবনটির অবৈধ নির্মাণে কোনো সরকারি কর্মকর্তা জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার দুপুরে বনানীতে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে বহুতল ভবন এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অর্ধ-শতাধিক মানুষ। শুক্রবারও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনটিতে উদ্ধার অভিযান চালিয়েছেন।