আপনি পড়ছেন

তাওয়াংয়ে চীন ও ভারতের বাহিনীর মধ্যে হওয়া সংঘর্ষ সম্পর্কে সম্প্রতি বেইজিংয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এর জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, বর্তমানে দেশ দুটির সীমান্তে পরিস্থিতি স্থিতিশীল। চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, ভাষ্য ও বিতর্ক দেশটির বন্ধুত্বহীন প্রতিবেশী বিষয়ে তাদের মানসিকতা সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য প্রকাশ করে।

tawang border india chinaতাওয়াং

গত ৯ ডিসেম্বর চীন ও ভারতের সেনারা বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ২০২০ সালের জুনে গালওয়ানে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সহিংস সংঘর্ষের পর এ ঘটনা দেশ দুটির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, মুখোমুখি সংঘর্ষে উভয়পক্ষের সেনারা সামান্য আহত হয়েছে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং সেক্টরে সংঘটিত হয়েছিল। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সীমান্তবর্তী একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ছয় ভারতীয় সেনা এ ঘটনায় আহত হয়েছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের একাংশ জানিয়েছে, সংঘর্ষে বেশি চীনা সেনা আহত হয়েছেন। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাওয়াংয়ের সংঘর্ষের কোনো বর্ণনা দেয়নি।

যদিও তারা বলেছে, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি সাধারণত স্থিতিশীল ছিল। চীনের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেন, ‘যতদূর আমরা জানি, চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল। দুই পক্ষ কূটনৈতিক এবং সামরিক চ্যানেলের মাধ্যমে সীমান্ত ইস্যুতে অবাধ সংলাপ অব্যাহত রেখেছে। বেইজিং নয়া দিল্লিকে উভয় নেতার গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যকে আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য, উভয় পক্ষের স্বাক্ষরিত চুক্তি এবং চুক্তির চেতনাকে কঠোরভাবে মেনে চলার এবং একসঙ্গে চীন-ভারত সীমান্ত অঞ্চলের শান্তি ও প্রশান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।’

তবে মজার বিষয় হলো- ভারতীয় এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতের সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশের ইয়াংজি এলাকার কাছে বিতর্কিত সীমান্তে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। তবে চীনা সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, চীন ও ভারতের মধ্যে সংঘর্ষের নির্দিষ্ট অবস্থান ডংঝাং এলাকা। এটি হচ্ছে জিয়াওকুন এবং বাংশানকোউ থেকে ২৫ কিলোমিটার পূর্বের একটি এলাকা, যেখানে ২০২১ সালের অক্টোবরে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়েছিল। এটি স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক যে বাংশানকোউ পাস হলো চীন এবং ভারতের মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের সীমানা বিন্দু। এটি সেই জায়গা যেখানে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের সময় তাওয়াংকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) আক্রমণ শুরু করেছিল।

সর্বশেষ সংঘর্ষের বর্ণনার বিষয়ে চীনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুওনা-তাওয়াংয়ের দিকে দুই পক্ষের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমানা রেখাটি এখন বাংশানকোউ পাস। চীনের সংবাদমাধ্যমের মতে, দক্ষিণ তিব্বতে ভারতীয় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডংঝাং বা নান জং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী এলাকা। চীনে একে অরুণাচল প্রদেশও বলা হয়। ডংঝাং এলাকা বলতে ল্যাংপো শহরতলীর দক্ষিণে বন উপত্যকা এলাকাকে বোঝায়, বা কুওনা কাউন্টিতে ল্যাংপো জিয়াং (এ ছাড়াও ল্যাম্পু শহরতলী)। কুওনা নদী-যাকে ল্যাংবো বা ডংঝাং নদীও বলা হয়-কুওনা কাউন্টিতে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। এটি আল্পাইন মালভূমিতে অবস্থিত, হিমালয়ের উত্তর পাদদেশে একটি বাতাসযুক্ত, ঠান্ডা এবং শুষ্ক আধা-শুষ্ক মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চল। নদী উপত্যকা এবং ল্যাংপো শহরতলীর দিকে ঘুরতে থাকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে, এটি হিমালয়ের দক্ষিণ পাদদেশে আর্দ্র, উষ্ণ এবং বৃষ্টির উপক্রান্তীয় পর্বতীয় আধা-আর্দ্র এবং আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলে প্রবেশ করে। ডংঝাং জলপ্রপাত একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান এবং এটি সেই স্থান যেখানে তিব্বতীয় বৌদ্ধ মাস্টার পদ্মসম্ভব অনুশীলন করেছিলেন বলে মনে করা হয়। ডংঝাং নদীর সংকীর্ণ বিন্দুতে অবস্থিত; শুষ্ক মৌসুমে যে কেউ আসলে পায়ে হেঁটে পার হতে পারে।

চীনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অতীতে নদীতে একটি কাঠের সেতু ছিল এবং চীনা ও তিব্বতিরা জলপ্রপাতের নিচ থেকে পবিত্র জল নিতে এবং নদী পার হতে পারত। তবে ২০০১ সালে কাঠের সেতুটি হারিয়ে যায়। পরবর্তীকালে ভারতীয় সেনারা ডংঝাং জলপ্রপাতের দক্ষিণে একটি নিরাপত্তা ফাঁড়ি বা সেন্ট্রি পয়েন্ট স্থাপন করে। একটি চীনা অনলাইন নিউজ ওয়েবসাইটে তাং বানহুর লেখা একটি দীর্ঘ নিবন্ধ অনুসারে, এটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪০তম মাউন্টেন ব্রিগেডের অধীনে জম্মু ও কাশ্মীর রাইফেলসের ১৯তম ব্যাটালিয়নের একটি প্লাটুন নিয়ে গঠিত। ভারতীয় সেন্ট্রি পয়েন্ট স্থাপনের পরে প্রায় ৩ হাজার ৫৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ডংঝাং জলপ্রপাত ভিউপয়েন্টের পাদদেশে চীনা সেনাদের গতিবিধি সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।

তাং বানহুর নিবন্ধ অনুসারে, ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রথম ১৯৬৮ সালে এই অঞ্চলে প্রবেশ করে। চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি ১৯৮৮ সালে নিয়মিত টহল চালাতে শুরু করে এবং স্থানীয় পশুপালকদের চারণে নিয়ে আসা শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যৌথ মাধ্যমে চীনা সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করা। পরে তারা মাইলা পাসের পূর্ব প্রান্তে প্রবেশ করলে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের বাধা দেয়। পরে সেখানে পাঁচটি তাবু স্থাপন করে ভারতীয় পক্ষ এবং দুর্গ নির্মাণ করে। পরে সেখোনে পিএলএর সীমান্তরক্ষীরা উপস্থিত হলে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

চীনের সংবাদমাধ্যম অনুসারে, গত ৯ ডিসেম্বর চীন ও ভারতের বাহিনীর মধ্যে ডংঝং এলাকায় সংঘর্ষটি গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর যা ঘটেছিল, তার পূনঃসূচনা মাত্র। গতবার ২৫০ থেকে ৩০০ চীনা সেনা থাকলেও এবার ৪০০ সেনা নিয়ে ভারতীয় টহলদলের মুখোমুখি হয়েছিল। এ সময় তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, যাতে ছয় ভারতীয় সেনা আহত হয়েছেন। তাদের গুয়াহাটির একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিভিন্ন চীনা সংবাদমাধ্যমের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরে তিনটি বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, আগামী বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন চীনসহ দক্ষিণ এশিয়া সফরের সঙ্গে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় বেইজিংয়ের সঙ্গে তাদের তাদের প্রতিবেশীদের দ্বন্দ্বগুলো একত্রিত করার চেষ্টা করেছেন চীনা কিছু বিশ্লেষক।

তারা বলছেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মহড়া, ফিলিপাইন-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া ও ভারতের সঙ্গে তাওয়াং সীমান্তের সংঘর্ষের উদ্দেশ্য হলো, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে চীনকে চারদিক দিয়ে ঘেরাও করা হবে। সীমান্ত রেখায় চীন ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার সাথে সাথে চীনা বিশ্লেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং এমনকি তাইওয়ানের বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোও সামনে উপস্থিত হবে।

দ্বিতীয়ত, চীনের সাথে সীমান্তে ভারতের অবকাঠামো নির্মাণের ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির বিশ্লেষকরা বলছেন যে বেইজিং ভারতীয় দুর্গ ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা হচ্ছে, ২০০১ সালে চীন ভারতের কাছে ডংঝাং জলপ্রপাত হারানোর প্রধান কারণ ছিল রাস্তার অভাব। ওই এলাকায় চীনের একটিও ফাঁড়িও ছিল না। এখন, চীন শুধু একটি শক্তিশালী সীমান্ত প্রতিরক্ষা স্থাপনা তৈরি করেনি, চীন মহাসড়ক এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে।

তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াংয়ের সীমান্ত বরাবর ভারতের লজিস্টিক এবং পরিবহন ক্ষমতার বৃদ্ধি বেইজিংয়ের কাছে ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে স্ববিরোধিতা থাকলেও বিভিন্ন চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভারতের সন্দেহের অবকাশ থাকা উচিত নয়। বেইজিং দিল্লির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও উসকানির অভিযোগ করলেও চীন দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষসহ সীমান্ত স্থবিরতা নিশ্চিত ত্বরান্বিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, বিশেষ করে সীমান্ত রেখার পূর্ব সেক্টরে। শীতকালে বছরের এই সময়ে সীমান্ত সংঘর্ষ শুরুর জন্য ভারতকে দোষারোপ করে আবারও ‘প্রতারণার কূটনীতি’ দেখালো চীন। আশ্চর্যের কিছু নেই যে চীনা পক্ষ লুকানোর কোনো চেষ্টা করেনি যে তারা তাওয়াংয়ের ঘটনায় বিস্মিত হয়নি।

সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট

Get the latest world news from our trusted sources. Our coverage spans across continents and covers politics, business, science, technology, health, and entertainment. Stay informed with breaking news, insightful analysis, and in-depth reporting on the issues that shape our world.

360-degree view of the world's latest news with our comprehensive coverage. From local stories to global events, we bring you the news you need to stay informed and engaged in today's fast-paced world.

Never miss a beat with our up-to-the-minute coverage of the world's latest news. Our team of expert journalists and analysts provides in-depth reporting and insightful commentary on the issues that matter most.