দরিয়া-ই-নূর: নবাব পরিবারের শতবর্ষী ঋণ ও ব্যাংকের ভল্টে বন্দি ১০৯ রত্নের রহস্য
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সোনালী ব্যাংকের একটি সুরক্ষিত ভল্টে নীরবে পড়ে আছে অমূল্য ‘দরিয়া-ই-নূর’ হীরাসহ ঢাকার নবাব পরিবারের ১০৯টি রত্ন। ১১৭ বছরের এই বন্দিদশার পেছনে রয়েছে নবাব সলিমুল্লাহর নেওয়া একটি ঋণ এবং তা নিয়ে তৈরি হওয়া এক জটিল ঐতিহাসিক বিতর্ক। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার এই রত্নভান্ডার যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ায় মালিকানার প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে, যা একটি স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনি সমাধানের দাবি জানাচ্ছে।

ঐতিহাসিক ঋণের প্রেক্ষাপট:
আধুনিক ঢাকার রূপকার নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন একাধারে প্রভাবশালী এবং দানশীল। শিক্ষা বিস্তার ও জনকল্যাণে তার অঢেল অর্থ ব্যয় পরিবারকে ঠেলে দেয় তীব্র আর্থিক সংকটের দিকে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯০৭ সাল নাগাদ জনসেবামূলক কাজে তার ব্যয় ৩৭ লাখ রুপি ছাড়িয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ব্যক্তিগত সঞ্চয়, স্ত্রীর গয়না বন্ধক এমনকি মহাজনদের থেকেও ঋণ নেন।
ঋণদাতারা আদালতে মামলা করলে নবাব পরিবারের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে ব্রিটিশ সরকার এগিয়ে আসে। ১৯০৮ সালের ৬ আগস্ট নবাব সলিমুল্লাহ কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কাছ থেকে ১৪ লাখ রুপি ঋণ গ্রহণ করেন। এই ঋণের বিপরীতেই বন্ধক রাখা হয়েছিল তার অস্থাবর সম্পত্তি, যার মধ্যে ছিল দরিয়া-ই-নূরসহ সেই ঐতিহাসিক ১০৯টি রত্ন। সেই থেকেই এই অমূল্য সম্পদ প্রথমে ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, পরে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্বাধীনতার পর থেকে সোনালী ব্যাংকের ভল্টে সংরক্ষিত আছে।
ঋণ পরিশোধের বিতর্ক ও হারিয়ে যাওয়া তথ্য:
নবাব সলিমুল্লাহর নেওয়া ঋণটি ছিল ৩০ বছর মেয়াদি, যার পরিশোধের শেষ সময় ছিল ১৯৩৮ সাল। ৮৭ বছর পেরিয়ে গেলেও ভূমি সংস্কার বোর্ডের (পূর্বের কোর্ট অব ওয়ার্ডস) কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণটি সুদে-আসলে পরিশোধ হয়নি। তবে ঠিক কত টাকা পরিশোধ হয়েছিল বা বর্তমানে কত টাকা বকেয়া রয়েছে, সে সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই।
অন্যদিকে, ঢাকা নওয়াব এস্টেটের ১৯৩৭ সালের একটি চিঠি ভিন্ন কথা বলছে। এস্টেটের তৎকালীন ব্যবস্থাপক মৌলভি এম ইয়াহিয়ার লেখা সেই চিঠি অনুযায়ী, ১৬ লাখ ২৫ হাজার রুপি ঋণের বিপরীতে তখন মাত্র ৩ লাখ ৮৪ হাজার রুপি বকেয়া ছিল। এই তথ্যটি ঋণ পরিশোধের বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
উত্তরাধিকারীদের দাবি ও সরকারের ভূমিকা:
নবাব পরিবারের বর্তমান উত্তরাধিকারীরা রত্নগুলোর মালিকানা দাবি করছেন। নবাব সলিমুল্লাহর প্রপৌত্র খাজা নাইম মুরাদ (চিত্রনায়ক নাইম) বলেন, ‘নবাব সলিমুল্লাহর ঋণ থেকে থাকলে তার উত্তরসূরি হিসেবে আমরা তা পরিশোধ করতে চাই। সরকার ও নবাব পরিবারের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি করে ঋণসংক্রান্ত সব তথ্য উন্মোচন করতে হবে এবং আমাদের সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে।’
তাদের প্রশ্ন, বিভিন্ন সময়ে সরকার যখন আহসান মঞ্জিলসহ নবাবদের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেছে, তখন প্রাপ্য অর্থ থেকে কেন ঋণের টাকা সমন্বয় করা হলো না?
এই পরিস্থিতিতে গত ২৬ মে ভূমি মন্ত্রণালয় রত্নগুলো যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করলেও দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সেই কমিটির কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। নবাব পরিবার কমিটিতে তাদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত:
ইতিহাস গবেষকরা বলছেন, এই ঐতিহাসিক জটের দ্রুত অবসান হওয়া প্রয়োজন। গবেষক হাশেম সূফী এবং আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের সাবেক কিপার অধ্যাপক মো. আলমগীর উভয়েই একমত যে, রত্নগুলো নিঃসন্দেহে ঢাকার নওয়াব এস্টেটের সম্পত্তি। তাদের মতে, ঋণ পরিশোধের বিষয়টি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে নবাব পরিবারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি আইনগত সমাধানে আসা উচিত। ইতিহাসের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় অনির্দিষ্টকাল ধরে রহস্যে ঘেরা থাকতে পারে না।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.