হাসিনার রায় নিয়ে যা বলছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), জাতিসংঘ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিচার চলাকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, বাংলাদেশে এই রায়কে স্বাগত জানানো হবে, কারণ জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য শেখ হাসিনার দায়বদ্ধতা নিয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ আছে।

এদিকে, রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয়েছে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া মেনেই বিচারকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম। তিনি এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে এটিকে বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতির অঙ্গীকারের পুনঃপ্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেন। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে এবং পলাতক সাবেক এই নেতাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছে।
তাহলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কেন এই রায়ের বিরোধিতা করল? এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
এইচআরডব্লিউ: হাসিনার বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংস্থাটির গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, এই বিচার প্রক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণাঙ্গ সুযোগ, সাক্ষী জিজ্ঞাসাবাদ এবং নিজেদের পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের অধিকারের মতো আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচারের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করা হয়নি।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ওপর নৃশংস দমনপীড়নের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে উভয় নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়। দুজনেরই বিচার তাদের অনুপস্থিতিতে হয়েছে এবং তারা নিজেদের পছন্দমতো আইনজীবীর প্রতিনিধিত্ব পাননি। এ মামলার তৃতীয় অভিযুক্ত, সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাটি আরও বলেছে, অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চালানোর বিষয়টি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে, যেখানে আসামির সশরীরে উপস্থিতি, আইনজীবীর প্রতিনিধিত্ব, প্রমাণ হাজির এবং সাক্ষী পরীক্ষাসহ বিভিন্ন অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এইচআরডব্লিউ জানায়, ‘মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।’ সংস্থাটি মৃত্যুদণ্ডকে ‘জন্মগতভাবে নিষ্ঠুর’ আখ্যা দিয়ে সব ক্ষেত্রেই এর বিরোধিতা করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর: মৃত্যুদণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় গত বছরের প্রাণঘাতী বিক্ষোভ দমনের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’। তবে রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় সংস্থাটি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ওএইচসিএইচআর জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের বিক্ষোভে সংঘটিত ‘গুরুতর লঙ্ঘনের’ শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের এই রায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। জাতিসংঘের এই দপ্তর উল্লেখ করেছে, তারা তাদের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে কমান্ড পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিসহ সব অপরাধীর জবাবদিহির জন্য বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘যদিও আমরা এই বিচার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করিনি, তবে আমরা ধারাবাহিকভাবে সব ধরনের জবাবদিহিমূলক কার্যক্রম, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছ ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিতের পক্ষে কথা বলেছি। এক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ বিচারটি অনুপস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছে এবং এর ফলে মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’
সংস্থাটি আরও জানায়, ‘আমরা মৃত্যুদণ্ড আরোপ করায় অসন্তোষ প্রকাশ করছি, কারণ আমরা সব পরিস্থিতিতেই এর বিরোধিতা করি।’
অ্যামনেস্টি: হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার হয়নি
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সোমবার (১৭ নভেম্বর) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার গণহত্যার শিকার ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পায়নি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড এক বিবৃতিতে বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের সময় সংঘটিত গুরুতর লঙ্ঘন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের জন্য যারা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী, তাদের অবশ্যই ন্যায্য বিচারের মাধ্যমে তদন্ত ও বিচার করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে এই বিচার বা রায় কোনোটিই ন্যায্য বা সঠিক নয়। ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রয়োজন, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘনকেই আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি চূড়ান্ত নিষ্ঠুর, অবমাননাকর এবং অমানবিক শাস্তি, যার কোনো বিচার প্রক্রিয়ায় স্থান হতে পারে না।’
অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, ‘এটি কোনো ন্যায্য বিচার ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ভুক্তভোগীরা এর চেয়ে ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য। বাংলাদেশের এমন একটি বিচার প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যা সব ধরনের সন্দেহের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষ হবে এবং মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশ্রয় নেবে না। কেবল তখনই প্রকৃত ও অর্থবহ সত্য, ন্যায়বিচার এবং প্রতিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ: হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন কঠিন
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সোমবার (১৭ নভেম্বর) জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাবর্তন করার সম্ভাবনা এখন খুবই ক্ষীণ। সংস্থাটি মনে করে, এই রায়ের রাজনৈতিক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
এক বিবৃতিতে গ্রুপটি জানায়, ‘এই প্রক্রিয়াটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল না। অনুপস্থিতিতে বিচার প্রায়শই বিতর্কের জন্ম দেয় এবং এক্ষেত্রে যে দ্রুততার সঙ্গে শুনানি সম্পন্ন করা হয়েছে এবং আসামিপক্ষের জন্য সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিল, তা বিচারকার্যের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এই সমালোচনাগুলো বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জকেই প্রতিফলিত করে, যা সমাধানে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। তবে এই সমালোচনাকে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশের কর্মকাণ্ডকে খাটো করে দেখার জন্য ব্যবহার করা উচিত হবে না।’
ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিন বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি (শেখ হাসিনা) আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকার করবেন, ততক্ষণ দলটিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফেরার অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বোমা হামলা এবং আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী ‘লকডাউনের’ ডাক দেশটিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি উত্তেজনার মধ্যে ফেলেছে।
কিন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের উচিত সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত দলটির সমর্থকদের ওপর কঠোর দমনপীড়ন এড়িয়ে চলা।’ তিনি জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার এই রায় বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানানো হবে, যেখানে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য তার দায়বদ্ধতা নিয়ে খুব কমই সন্দেহ রয়েছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.