ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন: বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও মেরুকরণ, জরুরি বৈঠকের ডাক
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটকের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের মিত্ররা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আহ্বান জানালেও রাশিয়া, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বহু দেশ একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে।

ঘটনার বিবরণ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলায় একটি ‘বড় আকারের হামলা’ চালিয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন যে, এই অভিযানের মাধ্যমে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে এবং বিচারের মুখোমুখি করার জন্য তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা একটি নিরাপদ, সঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত দেশটি পরিচালনা করব।’
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ করে আসছিল। তবে ভেনেজুয়েলার সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন আরও জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার বিধ্বস্ত তেল অবকাঠামো মেরামত করতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে শতকোটি ডলার বিনিয়োগ করবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা দেখা গেছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি একে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সরাসরি ফোন করে নিজের আপত্তির কথা জানিয়ে বলেন, ‘সার্বভৌম একটি জাতির ওপর একপাক্ষিক হামলা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।’
ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া:
হামলার পরপরই ভেনেজুয়েলা সরকার দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ শুরুতে জানিয়েছিলেন, কারাকাস মাদুরোর অবস্থান সম্পর্কে অবগত নয় এবং তিনি মাদুরো যে জীবিত আছেন, তার প্রমাণ দাবি করেন। ভেনেজুয়েলা সরকার অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির একাধিক রাজ্যে বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও উদ্বেগের ঝড়:
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। দক্ষিণ আফ্রিকা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে, ‘এ ধরনের বেআইনি ও একপাক্ষিক শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা এবং জাতিসমূহের মধ্যে সমতার নীতিকে ক্ষুণ্ন করে।’
চীন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘আধিপত্যবাদী আচরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘চীন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন শক্তি প্রয়োগ এবং দেশটির প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।’
রাশিয়া ভেনেজুয়েলার সরকারের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং একে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে। ইরান একে জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো সতর্ক করে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘দ্বিতীয় ভিয়েতনাম’ হতে পারে।
পশ্চিমা বিশ্ব ও মিত্রদের সমর্থন:
বিপরীত চিত্র দেখা গেছে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ায়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মাদুরোর আটকের পর ভেনেজুয়েলায় একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আসন্ন পরিবর্তন অবশ্যই শান্তিপূর্ণ হতে হবে এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মাদুরোকে ‘অবৈধ প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, তার শাসনের অবসানে তারা বিচলিত নন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সা’র ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ হিসেবে কাজ করছে। ইউক্রেনও মাদুরো প্রশাসনের বৈধতা অস্বীকার করে ভেনেজুয়েলার জনগণের অধিকারের পক্ষে থাকার কথা জানিয়েছে।
জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎজের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ফ্রিডরিখ মার্জ বিষয়টির আইনি মূল্যায়নকে ‘জটিল’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এড়ানো এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সংযত হওয়ার আহ্বান ও কূটনৈতিক তৎপরতা:
তুরস্ক ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে সব পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আঙ্কারা জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে সংকট সমাধানে সাহায্য করতে প্রস্তুত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া ক্লাস এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
কাতার অবিলম্বে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় অবদান রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াও উত্তেজনা প্রশমন ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে।
নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ভ্রমণ সতর্কতা:
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কলম্বিয়ায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস আমেরিকান নাগরিকদের ভেনেজুয়েলা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা (লেভেল ৪) জারি করেছে এবং যারা সেখানে আছেন তাদের অবিলম্বে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপাইনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। অনেক দেশ জরুরি ভিত্তিতে তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও করছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.