পৌষের শেষ ভাগে এসে হাড়কাঁপানো শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ উপকূলীয় জনপদ। ঘন কুয়াশা আর উত্তরের হিমেল হাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। তীব্র শীতের প্রভাবে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা, সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ।

ফাইল ছবি

আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় জেলাটিতে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ। স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, আগামী ১১ অথবা ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত এই শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। কেবল চুয়াডাঙ্গা নয়, তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে ঝিনাইদহ, যশোর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও মাগুরাসহ আশপাশের জেলাগুলোতেও। ঝিনাইদহে রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে।

উত্তরাঞ্চলজুড়ে শীতের দাপট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকালে রংপুরে ১১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হলেও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তা ছিল ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি। এছাড়া কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১০ দশমিক ৫, দিনাজপুরে ৯, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯ দশমিক ৫, গাইবান্ধায় ৯ দশমিক ৯ এবং লালমনিরহাটে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই শৈত্যপ্রবাহে দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে।

শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, গত দুই সপ্তাহে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে নয়জন শিশু ও সাতজন বয়স্ক ব্যক্তি রয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, শীতকালে সাধারণত নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস ও শ্বাসকষ্টের মতো রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও রোগীর চাপ বেড়েছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

উপকূলীয় জেলাগুলোতেও শীতের তীব্রতা জনজীবনকে কাহিল করে তুলেছে। কক্সবাজারে মঙ্গলবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হলেও অনুভূত তাপমাত্রা ছিল আরও কম। কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান ব্যাখ্যা করেন, শীত কেবল তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে না, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রার ওপরও অনেকটা নির্ভরশীল। ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত না হলে এবং রোদের উপস্থিতি কম থাকলে শীত বেশি অনুভূত হয়। পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমছে। বগুড়া থেকে আসা পর্যটক আল আমিন চৌধুরী বলেন, ‘এবার কক্সবাজারে শীত বেশি, ভালো লাগছে পরিবেশটা। সময় পেলেই চলে আসি, দুই-তিন দিন থাকার ইচ্ছে আছে।’

সাতক্ষীরায় গত দুই দিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি বললেই চলে। সোমবার সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, পুরো জানুয়ারি মাসজুড়েই এমন আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে এবং তাপমাত্রা আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। উপকূলীয় এই জেলায় কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসের কারণে দিনের বেলাতেও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করছে।

শীতের এই বৈরী আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক ও কৃষি শ্রমিকরা। ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন মোড়ে কাজের সন্ধানে এসে ফিরে যাচ্ছেন অনেকে। ঝিনাইদহের মাটিকাটা শ্রমিক নেকবার মণ্ডল জানান, শীতের কারণে কাজ করা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। গ্রাম বা শহরে নির্মাণকাজ ও কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ শ্রমিকরা। কক্সবাজারের রিকশাচালক নুরুল আমিন বলেন, ‘আগে ভোরে ঘর থেকে বের হতাম এখন শীতের কারণে তাও পারছি না, সূর্যের দেখা নাই। ইনকাম কমেছে এবং ঠান্ডা সামলাতে কষ্টও হচ্ছে।’

শিক্ষার্থীদের ওপরও শীতের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চুয়াডাঙ্গার রিফা নামের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, তীব্র শীতে ভ্যান বা ইজিবাইকে চড়া কঠিন, তাই হেঁটেই যাতায়াত করতে হচ্ছে। ঠান্ডায় হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। অনেক অভিভাবক শিশুদের স্কুলে পাঠাতে দ্বিধাবোধ করছেন, ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমে গেছে। শহরের বিভিন্ন মোড় ও চায়ের দোকানে নিম্ন আয়ের মানুষদের আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না, ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যেও দেখা দিয়েছে মন্দা।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.