প্রবাল বাঁচাতে কড়াকড়ি পর্যটন: সেন্ট মার্টিনে সীমিত হচ্ছে চলাচল, ৪ জোনে ভাগ
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করতে বড় ধরনের সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে সরকার। অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়া দ্বীপের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে পর্যটন এলাকা সীমিত করে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা চালুর প্রস্তাব এসেছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো আট বর্গকিলোমিটার দ্বীপকে চারটি আলাদা জোনে ভাগ করে পর্যটকদের চলাচল ও রাতযাপন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে পর্যটক সংখ্যা নির্ধারণের আগেই সেন্ট মার্টিনে প্রতিদিন গড়ে ৭ হাজারের বেশি পর্যটক রাত যাপন করতেন, যা দ্বীপটির পরিবেশগত ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। এর ফল হিসেবে প্রবাল সংগ্রহ, নৌযানের তেলদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও শব্দদূষণ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই চাপ অব্যাহত থাকলে দ্বীপটির অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, গত চার দশকে সেন্ট মার্টিনে প্রবাল প্রজাতি ১৪১টি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০টিতে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সতর্ক করেছে- এই ধারা চলতে থাকলে ২০৪৫ সালের মধ্যেই দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হয়ে পড়তে পারে।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় সেন্ট মার্টিনকে চারটি জোনে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জোন-১: সাধারণ ব্যবহার এলাকা; এই এলাকাকেই পর্যটন ও আবাসনের কেন্দ্র করা হবে। দ্বীপের অন্যান্য অংশে থাকা সব হোটেল ও রিসোর্ট ধাপে ধাপে এখানে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯০০ জন পর্যটক এখানে রাত যাপন করতে পারবেন। সৈকতে যানবাহন চলাচল, প্রবাল সংগ্রহ, রাতের আলোকসজ্জা ও দূষণমূলক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে।
জোন-২: নিয়ন্ত্রিত সম্পদ এলাকা; দ্বীপের সংবেদনশীল দক্ষিণাংশকে ঘিরে এই জোন থাকবে বাফার হিসেবে। এখানে পর্যটন অবকাঠামো, ক্ষতিকর কৃষি রাসায়নিক ব্যবহার, সৈকতে আগুন জ্বালানো বা রান্নাবান্না নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জোন-৩: টেকসই ব্যবস্থাপনা অঞ্চল; জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই এলাকায় কোনো ধরনের বসতি, স্থাপনা নির্মাণ বা পরিবেশ ধ্বংসকারী কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। ম্যানগ্রোভ বন, ল্যাগুন ও কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র থাকবে বিশেষ সুরক্ষায়।
জোন-৪: ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ এলাকা; এটি সবচেয়ে কঠোরভাবে সংরক্ষিত অঞ্চল। সাধারণ মানুষের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ থাকবে। পর্যটকেরা ৫০০ থেকে ১ হাজার মিটার দূর থেকে দ্বীপটি দেখতে পারবেন, তবে সেখানে নামার সুযোগ থাকবে না। আশপাশের এলাকায় মাছ ধরা ও দূষণও নিষিদ্ধ করার সুপারিশ রয়েছে।
সেন্ট মার্টিনে বসবাস করে প্রায় দেড় হাজার পরিবার, যাদের আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন ও মাছ ধরা। খসড়া পরিকল্পনা বলছে, দ্বীপের ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে এবং পর্যটন সীমিত হলে তাদের জীবিকায় বড় প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, দ্বীপ রক্ষায় নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের বিকল্প নেই। তবে পর্যটন হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক। বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য মৎস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় আলাদা প্রকল্প হাতে নিচ্ছে, যার একটি অর্থায়ন হবে দেশের নিজস্ব জলবায়ু তহবিল থেকে।
মহাপরিকল্পনার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে সেন্ট মার্টিনে সবুজ আচ্ছাদন কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ, কৃষিজমি কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণের কারণে পর্যটন অবকাঠামো দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে কমেছে ম্যানগ্রোভ বন, যা দ্বীপের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ না আনলে বহিরাগত বিনিয়োগ ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন দ্বীপের পরিবেশ ও স্থানীয় সমাজব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে।
১০ বছর মেয়াদি এই মহাপরিকল্পনার প্রথম পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। পরবর্তী পাঁচ বছরে হবে নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা মূল্যায়ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী সেন্ট মার্টিনের মতো সংকটাপন্ন এলাকা সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করাই সাফল্যের চাবিকাঠি।
পরিবেশবিদদের সতর্কতা স্পষ্ট, সেন্ট মার্টিন শুধু পর্যটনের গন্তব্য নয়, এটি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই প্রবালদ্বীপ কেবল স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.