জুলাই সনদ: গণভোটে সরকারের ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা, নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
- Details
- by ২৪ ডেস্ক
সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত একগুচ্ছ প্রশ্নে আসন্ন গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি জোরদার হলেও শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে আসছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো নিয়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফা মনে করেন, গণভোটে ভোটারদের সামনে কেবল দুটি বিকল্প- ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এমন প্রত্যাশাই থাকে। কিন্তু বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচারণায় নেমেছে, তাও আবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় করে। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি তহবিল ব্যবহার করে একটি পক্ষের পক্ষে প্রচার চালানো কতটা নৈতিক ও গণতান্ত্রিক?
সমালোচকদের মতে, সরকারের এ ধরনের আচরণ কার্যত করদাতাদের অর্থ-যার মধ্যে সম্ভাব্য ‘না’ ভোটারদের অর্থও রয়েছে একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে ব্যয় করার শামিল। বিদ্রুপ হলো, যে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতেই এই সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, সেই অপব্যবহারই যেন নতুন করে দেখা যাচ্ছে।
সরকার অবশ্য কোনো স্বার্থসংঘাত দেখছে না। সরকারের প্রতিনিধিরা বলছেন, গণভোটে কোনো একটি অবস্থানের পক্ষে প্রচারণা চালাতে আইনগত কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজ বলেন, ‘গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলায় কোনো আইনগত বা সাংবিধানিক বাধা নেই। সংশ্লিষ্ট আদেশে এমন কিছু বলা হয়নি যে আমি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলতে পারব না।
আইনগতভাবে কথাটি সত্য হলেও, সমালোচকদের মতে মূল প্রশ্নটি আইন নয়, বরং গণতান্ত্রিক রীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীনদের কর্তৃত্ববাদী আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সংকটে ফেলেছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া যেখানে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার কথা বলছে, সেখানে সরকারের এমন পক্ষপাতমূলক ভূমিকা সেই লক্ষ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যখন প্রকাশ্যেই একটি পক্ষের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ফলাফল ‘নিশ্চিত’ করার আশঙ্কা তৈরি হয়। অতীতে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রশাসনিক প্রভাবের নজির থাকায় এই শঙ্কা অমূলক নয় বলেই মনে করছেন অনেকে।
সমালোচকরা বলছেন, সরকার চাইলে নিরপেক্ষ সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে পারত-যেখানে কেবল প্রশ্নগুলো ব্যাখ্যা করা হতো এবং ভোটারদের অংশগ্রহণে উৎসাহ দেওয়া হতো। কিন্তু ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরাসরি প্রচারণা চালিয়ে সরকার যেন আগেভাগেই সংসদের জন্য একটি ‘ফে অ্যাকঁপ্লি’ তৈরি করতে চাইছে।
গণভোটের নকশা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। চারটি ভিন্ন প্রশ্ন থাকলেও ভোটাররা আলাদা আলাদা করে মত দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট চারটি প্রস্তাবের ওপর একসঙ্গে প্রযোজ্য হবে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনে জুলাই চার্টার অনুসরণ, ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, পরবর্তী সরকারকে ৩০টি সাংবিধানিক সংশোধনী বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা এবং জুলাই চার্টারে উল্লিখিত অন্যান্য সংস্কার বাস্তবায়ন।
সমালোচকদের মতে, এতে ভোটারদের সামনে ‘সব নয় কিছুই নয়’ ধরনের কঠিন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কোনো একটি প্রস্তাব সমর্থন করলেও অন্যটির বিরোধিতা করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
আরও বড় প্রশ্ন হলো, এই গণভোট কার্যত সংসদের সাংবিধানিক ভূমিকা খর্ব করছে কি না। বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের মাধ্যমে সরাসরি সংশোধনী আনার কোনো বিধান নেই। সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংশোধনী পাস হওয়ার কথা।
এ অবস্থায় ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট বিপুল সাংবিধানিক জ্ঞান ও সচেতনতা দাবি করছে, যা একজন সাধারণ ভোটারের পক্ষে অর্জন করা কঠিন। ফলে এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি অস্বস্তিকর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, জুলাই চার্টার নিয়ে গণভোট শুধু সংস্কার নয়, বরং সরকারের নিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক রীতি এবং সাংবিধানিক কাঠামো সবকিছুকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.