আপনি পড়ছেন

বৈশ্বিক অর্থনীতির নানামুখী অস্থিরতা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের রপ্তানি আয়ে রেকর্ড ১১ দশমিক ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে মাসিক ভিত্তিতে অন্যতম বড় সাফল্য। তবে এই অর্জনের বিপরীতে রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্যহীনতা ও গুটিকয় দেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা।

ছবি - সংগৃহীত

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি করে আয় করেছে ৪ হাজার ৪১৩ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর আগের মাস, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯৬৮ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৪১০ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলারে। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় (২৮ হাজার ৯৬৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলার) এই অঙ্ক কিছুটা কম, তবু জানুয়ারির শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি খাতটিতে স্থিতিশীলতা ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রপ্তানি আয়ের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত তার আধিপত্য বজায় রেখেছে। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এ খাত থেকে ২২ হাজার ৯৮০ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। পোশাকের পাশাপাশি হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে হিমায়িত মাছ ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো খাতগুলোতে ফলাফলে মিশ্র প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস যুক্তরাষ্ট্র। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে মার্কিন বাজারে ৫ হাজার ২১৬ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। বিদায়ী বছরের শেষ দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য শুল্কনীতির আশঙ্কায় মার্কিন ক্রেতারা আগাম পণ্য আমদানি বাড়ান, যার প্রভাবে এই বাজারে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরেই বাংলাদেশের বড় রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে রয়েছে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য, যেখানে রপ্তানি আয় যথাক্রমে ২ হাজার ৮৫২ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার ও ২ হাজার ৭৭৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলার।

সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল চিত্রের উল্টো পিঠে রয়েছে বাজার কেন্দ্রীভূত থাকার ঝুঁকি। ২০২৫ সালের বর্ষপঞ্জির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই (৭৯ দশমিক ৯২ শতাংশ) যাচ্ছে মাত্র ১১টি দেশে। এই ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিই ঐতিহ্যবাহী বাজার এবং কেবল জাপানকে নতুন বা নন-ট্র্যাডিশনাল বাজার হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০২৫ সালে মোট ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির মধ্যে ৩১ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলারই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, পোল্যান্ড, কানাডা, জাপান ও ডেনমার্ক থেকে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের (বিএই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল এ বিষয়ে বলেন, ‘বিলিয়ন ডলারের বাজার থাকা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রায় ৮০ শতাংশ রপ্তানি যদি মাত্র ১১টি দেশে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়। এখনই নতুন ও নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারে কৌশলগত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ইইউতে রপ্তানি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও মজুরি বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসী বাজার দখলের কৌশলের কাছে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। তিনি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রতিযোগী দেশগুলোর বাড়তি প্রণোদনার বিষয়টি উল্লেখ করে সংকট মোকাবিলায় সরকারি নীতিগত সহায়তার ওপর জোর দেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানিত ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান এ পরিস্থিতির জন্য ধীরগতির নীতিগত সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে বাণিজ্য স্থানান্তর ঘটেছে, বাংলাদেশ তা থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা নিতে পারেনি। ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে যেখানে এগিয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশ সীমিত বাজার বৈচিত্র্য ও অতি নির্ভরতার কারণে পিছিয়ে পড়েছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার নতুন বাজারগুলোতে প্রবেশের প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। অন্যথায়, গুটিকয় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে বড় কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণ হতে পারে।

গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...

খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর

Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.

Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.