বিশেষজ্ঞ মত: ইইউ চুক্তির প্রভাবেই যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য সমঝোতা
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা করেছে, যা কয়েক মাস আগের দুই দেশের শুল্ক সংক্রান্ত অচলাবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবেই ওয়াশিংটন তড়িঘড়ি করে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া ব্রিকস জোটের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা এবং মার্কিন ডলারের আধিপত্য ধরে রাখার বিষয়টিও এই চুক্তির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ফোনালাপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির ঘোষণা দেন। সে সময় তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চমৎকার সম্পর্ক সামনে আরও জোরদার হবে।’
হোয়াইট হাউসের তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় দুই দেশই বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক কমাতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি, কৃষি ও শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শুল্ক পদ্ধতি সহজ করা, মেধাস্বত্ব রক্ষা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগ মোটেও আকস্মিক নয়। ইইউর সঙ্গে ভারতের উচ্চাভিলাষী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেই যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা এল। ইইউর সঙ্গে ভারতের ওই চুক্তি বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহকে নতুন রূপ দিতে পারে এবং ভারতের বিশাল বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকারকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে দ্য ওয়্যার-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং এশীয় অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক এম কে ভেনু বলেন, ‘ইইউ-ভারত এফটিএ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে ইইউ ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পিছিয়ে পড়বে। সম্ভবত এ কারণেই ট্রাম্প দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন।’
এম কে ভেনুর এই মন্তব্যে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে তারা নয়াদিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধাগুলো হারাতে পারে।
তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাস এই চুক্তি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভারত শূন্য বা সীমিত শুল্কের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, তিনি কোনো ঘটনা ঘটার ঘোষণা দেন, কিন্তু এর বিস্তারিত তখনো চূড়ান্ত থাকে না।’
ইইউ ও ভারতের মধ্যে এফটিএ গত মাসের শেষের দিকে উন্মোচন করা হয় এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে ২০২৭ সালের মধ্যে এটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা একে দশকের অন্যতম কৌশলগত বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এম কে ভেনু আনাদোলু এজেন্সিকে জানান, চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৩৪ শতাংশ আমদানি শুল্কের বাধার মুখে পড়লেও ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তিমূলক শুল্কের আওতাতেও ভারতের রপ্তানি স্থিতিশীল ছিল, যা প্রমাণ করে ওয়াশিংটনের অবস্থান নির্বিশেষে ভারতের বাজার প্রভাব বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের এই বাণিজ্য চুক্তি শুধু অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে গভীর ভূ-রাজনীতিও কাজ করছে। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস জোটের প্রভাব কমানো এবং ডলারের আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমনকি ডলার-কেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কাজ করা দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন। এম কে ভেনু বলেন, ‘ট্রাম্প চান ভারত যেন ব্রিকস থেকে সরে আসে।’
তবে ভারতের অভ্যন্তরে এই চুক্তি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো যুক্তি দিচ্ছে, ট্রাম্প পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলার পণ্য কেনার যে লক্ষ্যমাত্রার কথা বলছেন, তা বর্তমান ৪৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানির তুলনায় অবাস্তব। তারা সতর্ক করে বলছেন, এমন প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে উল্টে দিতে পারে এবং কৌশলগত স্বকীয়তা ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
কৃষিখাত নিয়ে ভারতে বিশেষ সংবেদনশীলতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি আইনপ্রণেতাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, আলোচনা চলাকালে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা হবে। এ ছাড়া জ্বালানি খাত নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। ট্রাম্প ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারতকে রাশিয়ার তেল আমদানি কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে, যা মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি করতে পারে।
অধ্যাপক লুকাস ট্রাম্পের আগের শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কোনো সুসংহত বাণিজ্য কৌশল নয়, বরং রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পেছনে কোনো স্পষ্ট যুক্তি ছিল না।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের এই রূপরেখা যদি আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পরিণতও হয়, তবু তা কার্যকর হতে আইনি ও পদ্ধতিগত বাধা পেরোতে হবে। এর ফলে প্রকৃত সুবিধা পেতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তবে মার্কিন শুল্ক কমলে ভারতের ওষুধ, বস্ত্র, রত্ন ও কৃষিখাত উপকৃত হতে পারে এবং প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় অগ্রগতি আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.