পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ভরাডুবির কারণ কী
- Details
- by আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে চমক দেখিয়েছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটি পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছে। রাজ্যের টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও হেরেছেন।

প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি। ১০ কোটিরও বেশি মানুষের রাজ্যের এই নির্বাচন কোনো সাধারণ রাজ্য বিধানসভার ভোট ছিল না, বরং তা ছিল একটি গোটা দেশের সরকার নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ। মোদির ১২ বছরের শাসনামলে এই জয় অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। এটি কেবল তিন মেয়াদের এক জনপ্রিয় নেত্রীর পরাজয় নয়, বরং পূর্ব ভারতে বিজেপির দীর্ঘ পদযাত্রা বা ‘লং মার্চ’-এর চূড়ান্ত বিজয়।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত অর্ধ শতাব্দীতে কেবল একবার ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছিল। ৩৪ বছর বাম শাসনের পর ১৫ বছর দাপট দেখিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বাংলাকে এমন এক ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন, যেখানে একক আধিপত্যবাদী বা ‘হেজেমোনিক’ দলই জেতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপির এই জয় কোনো আকস্মিক মোড় নয়, বরং কয়েক দশকের সুপরিকল্পিত কাজের ফসল।
সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মা বলেন, বিজেপি গত তিনটি নির্বাচনে প্রায় ৩৯ শতাংশ ভোট পাচ্ছিল। এবার ৪৪ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ের রেখা অতিক্রম করেছে তারা।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, তৃণমূলের মতো শক্তিশালী তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন না থাকার পরও বিজেপি এই বিপুল জনসমর্থন আদায় করেছে। দলটির এই উত্থানের কারণ কী? এর পেছনে কাজ করেছে পাঁচ ‘ম’। ১৫ বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মা, মাটি, মানুষ— এই তিন ‘ম’-এর শক্তিতে পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন। সেই স্লোগানই পরবর্তী সময়ে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের টানা তিনটি নির্বাচনী জয়ের ভিত্তি হয়ে উঠেছিল।
এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতার সেই ভিত্তি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। নতুন করে পাঁচটি ‘ম’- মুসলিম, মহিলা, অভিবাসী (মাইগ্র্যান্ট), মতুয়া সম্প্রদায় এবং ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনি যন্ত্র (মেশিনারি) মমতার জয়ের ধারাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
তৃণমূলের সাফল্যের প্রধান ভিত্তি ছিল নারী ভোট। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নগদ সহায়তা প্রকল্প এবং ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে মমতা এই ভোটব্যাংক ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালে মোদি নারী-কেন্দ্রিক নানাবিধ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দুর্গে হানা দিয়েছেন। বিশেষ করে আরজি কর মেডিকেল কলেজে এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি নির্বাচনে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে তৃণমূলকে কোণঠাসা করে বিজেপি ভুক্তভোগী ওই নারীর মাকে পানিহাটি আসন থেকে প্রার্থী করে।
পশ্চিমবঙ্গের ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার নির্ধারক। ২০২১ সালে যেখানে ৩৫ শতাংশের বেশি মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে, এমন ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টি জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু ২০২৬ সালে মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোয় পরিস্থিতি বদেলেছে। এলাকাগুলোতে উন্নয়ন, ভোটার তালিকা এবং সুশাসনের প্রশ্নে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে।
তৃণমূল জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের ওপর ভরসা করছে। কংগ্রেসও পুনরুজ্জীবীত হওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল এআইএমআইএম সম্ভাব্য উদীয়মান ‘ভোট কাটার’ হিসেবে উঠে আসছে।
এবারের নির্বাচনে অনিশ্চিত ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল অভিবাসীরা। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্ক এবং নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের জন্য হাজার হাজার শ্রমিক বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। বিপুল সংখ্যক এই ভোটারের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফল আরও পরিবর্তনশীল করে তুলেছে।
এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লাখেরও বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে। এতে তৃণমূল কংগ্রেসই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। যদিও আসনভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করলে এই ক্ষতির পরিমাণ ও ব্যাপকতা আরও পরিষ্কার বোঝা যাবে। তবে তা সত্ত্বেও এটা বোঝাই যাচ্ছে এই গোটা প্রক্রিয়ায় মোটের ওপর লাভবান হয়েছে বিজেপিই। এই তালিকায় লাখ লাখ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন সেটা যেমন ঠিক, কিন্তু বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারেরও নাম যে বাদ পড়েছে তাতেও সন্দেহ নেই।
বিজেপি আগোগোড়াই দাবি করে এসেছিল, তালিকায় এই সব ভুয়া নামের কারণে তৃণমূল বছরের পর বছর ধরে ভোটে সুবিধা পেয়ে এসেছে, যা এবার বন্ধ হবে। দেখা যাচ্ছে সেই বক্তব্য অনেকটাই সত্যি প্রমাণ হলো।
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ মতুয়া সম্প্রদায়। তারা মূলত তফসিলি জাতিভুক্ত। এই বিশাল ভোটব্যাংকই বিজেপিকে রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এবারো মতুয়াদের নিরঙ্কুশ সমর্থন বিজেপির জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করেছে।
তৃণমূলকে টেক্কা দিতে বিজেপি এবার নিজেদের সাংগঠনিক যন্ত্র বা মেশিনারিকে ঢেলে সাজিয়েছিল। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের নিবিড় সমন্বয়, বুথ স্তরের ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রচারণাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় তারা। মাঠ পর্যায়ে সম্পৃক্ততাকেও বিজেপির নির্বাচনে ভাল ফল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে দেখা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহ্যগতভাবে ‘ক্যাডার-চালিত’ রাজ্য (বাম থেকে তৃণমূল)। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল স্তরে সুসংগঠিত ক্যাডার বা কর্মী বাহিনী রাজ্যের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। বিজেপি এবার তৃণমূলে কংগ্রেসের এই তৃণমূল স্তরের নেটওয়ার্কের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কিংবা টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
গুগল নিউজে আমাদের প্রকাশিত খবর পেতে এখানে ক্লিক করুন...
খেলাধুলা, তথ্য-প্রযুক্তি, লাইফস্টাইল, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহ সর্বশেষ খবর
Stay up-to-date with the latest news from Bangladesh. Our comprehensive coverage includes politics, business, sports, and culture. Get breaking news, analysis, and commentary on the issues that matter most to Bangladeshis and the international community.
Bangladesh is a country located in South Asia and is home to a diverse population of over 160 million people. It has a rich cultural heritage and a rapidly growing economy. News from Bangladesh covers a wide range of topics, including politics, economics, social issues, culture, and more. The country has made significant progress in recent years in areas such as poverty reduction, education, and healthcare. However, it still faces challenges such as corruption and environmental degradation. Bangladeshi news sources cover both local and international news to keep the public informed about the latest developments and events.